যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের দিগদানা গ্রামে বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী এক তরুণীকে ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে গর্ভপাত করানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামনে এসেছে একটি কথিত ‘আপোষনামা’। ভুক্তভোগীর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন থাকার সময় অর্থের বিনিময়ে ওই স্ট্যাম্পে পরিবারের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কথিত স্ট্যাম্পে অভিযুক্ত হায়দার আলীর স্ত্রী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে।
ঘটনাটি নিয়ে এর আগে ধর্ষণ, গর্ভপাত এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এবার সামনে আসা কথিত স্ট্যাম্পের বিষয়বস্তু ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ঘিরে দেখা দিয়েছে নতুন প্রশ্ন।
সংকটাপন্ন অবস্থার সুযোগে স্বাক্ষর?
অভিযোগ অনুযায়ী, গর্ভপাতের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তরুণীর শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীর পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দ্রুত অর্থ প্রদান এবং একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ওই স্ট্যাম্পে কথিতভাবে আপোষ-মীমাংসার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—একজন গুরুতর অসুস্থ ও বাক-শ্রবণপ্রতিবন্ধী ভুক্তভোগীর পরিবার থেকে ওই সময় কী পরিস্থিতিতে এবং কার উপস্থিতিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল? স্বাক্ষর নেওয়ার আগে পরিবারের সদস্যদের আইনগত অধিকার ও বিষয়টির পরিণতি সম্পর্কে যথাযথভাবে জানানো হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্ট্যাম্পে স্বামীর দায় স্বীকারের দাবি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে কথিত স্ট্যাম্পের একটি বক্তব্য ঘিরে। দাবি করা হচ্ছে, সেখানে অভিযুক্ত হায়দার আলীর স্ত্রী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন।
যদি ওই বক্তব্য সত্য ও প্রামাণ্য হয়, তাহলে সেটির প্রেক্ষাপট, স্বাক্ষরের পরিস্থিতি এবং বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে ওই লিখিত বক্তব্যকে পরবর্তীতে কীভাবে ‘আপোষনামা’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আসার দাবি উঠেছে।
১০ লাখ টাকার মীমাংসা চুক্তির অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ইসরাফিল নামের এক ব্যক্তি হায়দার আলীকে কথিতভাবে মীমাংসার মাধ্যমে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার জন্য ১০ লাখ টাকার চুক্তি করেন। এর প্রথম কিস্তি হিসেবে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অর্থের মধ্যে ৩ লাখ টাকা ভুক্তভোগীর পরিবারকে দেওয়া হয় এবং এর বিনিময়ে কথিত স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। বাকি ৫০ হাজার টাকা ইসরাফিল ও তাঁর সহযোগীদের কাছে থাকার অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে আরও সাড়ে ৬ লাখ টাকা দিলে হায়দার আলীকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অর্থ লেনদেন ও কথিত চুক্তির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘সভাপতির সভাপতিত্বে’ সালিশ, কিন্তু সভাপতির নাম নেই
কথিত স্ট্যাম্পে ‘সভাপতির সভাপতিত্বে’ সালিশ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে সভাপতির নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। বিষয়টি আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়ভাবে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে দিগদানা ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শাহজাহান কবির জানিয়েছেন, এমন কোনো সালিশ বা আপোষের বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং তিনি সেখানে উপস্থিতও ছিলেন না।
ফলে কথিত সালিশে কারা উপস্থিত ছিলেন, কে সভাপতিত্ব করেছেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় ওই দলিল তৈরি ও স্বাক্ষরিত হয়েছে—তা এখন তদন্তের বিষয়।
মূল স্ট্যাম্প ও অর্থ লেনদেনের হিসাব যাচাইয়ের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে কথিত স্ট্যাম্পের মূল কপি জব্দ করে এর সত্যতা যাচাই, স্বাক্ষরকারীদের বক্তব্য গ্রহণ, অর্থ লেনদেনের উৎস ও হিসাব অনুসন্ধান এবং কথিত সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদে এ বিষয়ে কোনো গ্রাম আদালত, সালিশ বা লিখিত নথি রয়েছে কি না, থাকলে সেটিও যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
ভুক্তভোগীর সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে কেউ যদি অর্থের বিনিময়ে ঘটনাটি মীমাংসা বা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে কথিত আপোষনামা, অর্থ লেনদেন ও দায় স্বীকারের দাবিগুলোর সত্যতা যথাযথ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ঝিকরগাছা (যশোর) প্রতিনিধি: 



















