নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাজেবুল ইসলাম অপূর্ব (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে দুর্গাপুর পৌরশহরের পুরাতন সিনেমা হল সড়ক এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে, তাজুল ইসলাম ওরফে ‘কিলার তাজুল’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসায় তাঁর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা ও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। তবে হত্যাকাণ্ডে কারা সরাসরি জড়িত, কে পরিকল্পনা করেছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ কী—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
পুলিশ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার অপূর্ব দুর্গাপুর পৌরশহরের উকিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা শমসের আলীর ছেলে। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ জানিয়েছেন, সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অপূর্বকে তাজুল ইসলামের সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রকৃতি, হত্যাকাণ্ডে তাঁর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততার বিষয় তদন্তসাপেক্ষ।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের কাছাকাছি তেলুঞ্জিয়া এলাকায় সাংবাদিক আলিফকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি রূপসী বাংলা আইপিটিভির নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখি করতেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী অনিন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে ১৬ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সাত থেকে আটজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। পরদিন রাতে অপূর্বকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্তে নতুন অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের পরিচয়, হামলার পরিকল্পনা এবং হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি।
আলিফ হত্যাকাণ্ডের আলোচনায় উঠে এসেছে ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি দুর্গাপুর পৌরশহরের উকিলপাড়া এলাকায় পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনাও। ওই দিন দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শফিকুলের মৃত্যু হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি জামালপুর পুলিশ লাইন্সের বেতার শাখায় কর্মরত ছিলেন এবং ছুটিতে নিজ বাড়ি দুর্গাপুরে এসেছিলেন। ওই হত্যা মামলায় অপূর্ব এজাহারভুক্ত আসামি বলে দুর্গাপুর থানার ওসি জানিয়েছেন।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের বরাতে সাংবাদিক আলিফের ওপর হামলার সঙ্গে আগের ওই ঘটনার সম্ভাব্য যোগসূত্রের কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক ছিল কি না, হামলাকারীরা কাউকে ভুল করে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল কি না, কিংবা আলিফকে আগে থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণ, ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়গুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় মাদক পাচার, চোরাচালান এবং অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ও উদ্বেগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত। তাজুল ইসলাম ও তাঁর কথিত সহযোগীদের ঘিরে যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, পুলিশের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি গুরুতর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তও জরুরি।
সাংবাদিক আলিফ বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখি করতেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর সাংবাদিকতার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। তবে তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন, ব্যক্তিগত বিরোধ, সম্ভাব্য হুমকি কিংবা অন্য কোনো কারণ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাজ করেছে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়। এ ক্ষেত্রে নিহতের পরিবার, সহকর্মী, পরিচিতজন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এখন তদন্তের প্রধান বিষয় হচ্ছে—হত্যাকাণ্ডে কারা সরাসরি অংশ নিয়েছিল, কে বা কারা পরিকল্পনা করেছিল, ব্যবহৃত আলামতের সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না এবং হত্যার পেছনে কোনো বিরোধ বা অন্য উদ্দেশ্য কাজ করেছে কি না। গ্রেপ্তার অপূর্বের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও তদন্তে সংগৃহীত অন্যান্য প্রমাণ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে আগের এসআই শফিকুল হত্যা মামলার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র থাকলে সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা জরুরি।
সাংবাদিক হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা শুধু নিহতের পরিবারের ন্যায়বিচারের জন্য নয়, গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনায় জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন মহল।
সাংবাদিক আলিফ হত্যা: অপূর্ব গ্রেপ্তার, তাজুলকে ঘিরে তদন্তের দাবি(পলাশ পাল
-
, নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি) - আপডেট সময় : ০৯:১৪:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
- 3
জনপ্রিয় সংবাদ



















