কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তার চরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পাড় ও আমনের ফসলি জমিতে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে করে একরকময় একর ফসলি জমি তলিয়ে তা তিস্তার গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। চরের নিম্নাঞ্চলের আমন চাষির স্বপ্ন এখন নদী গর্ভে।
এছাড়া পাড় ভেঙে বাড়ি-ঘর হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। পাড়ের মানুষ জিও ব্যাগ না পেয়ে নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের জঙ্গল, বাঁশ, কলাগাছ ও ছোট বড় গাছ দিয়ে পাড় ভাঙন রোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। একরকম একর ফসলি জমি বাড়ি-ঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় সব হাড়িয়ে উপায় না পেয়ে তারা খোলা আকাশের নীচে কিংবা অন্যের জমিতে বসবাস করে আসছেন।
এসময় তারা জানান, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে তীব্র থেকে তীব্রতর ভাঙন দেখা দিবে। যা কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের পাড়ের ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। এসকল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা পুনর্বাসন, ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ সহ স্থায়ী সমাধানের দাবী জানান।
কুড়িগ্রাম জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা যায়, শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) তিস্তার পানি বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে তিস্তার চরের নিম্ন চরাঞ্চল গুলো প্লাবিত হয়েছে। এতে করে ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়া সহ পাড়ের ফসলি জমি ও বাড়ি-ঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া উলিপুর উপজেলার ভাঙন এলাকা গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। জিও ব্যাগের চাহিদা পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বরাদ্দ চলে আসলে ভাঙন রোধে কাজ করা হবে বলে জানান তারা।
জানা যায়, উপজেলায় ১টি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪টি ইউনিয়ন দলদলিয়া, থেতরাই, গুনাইগাছ ও বজরা তিস্তা নদী দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে। এসকল ইউনিয়নে প্রতি বছর তীরের পাড় এবং ভেসে উঠা চরাঞ্চলের শতশত মানুষের বসতভিটা ও একরময় একর জমি তিস্তা গর্ভে বিলীনে নিঃস্ব হচ্ছে। এসব ইউনিয়নে তিস্তা নদীর ভাঙন কবলিত এলাকার মধ্যে চাপরারপাড় হাজিপাড়া, উচ্চগ্রাম, বসনিয়াপাড়া, মুন্সিপাড়া, কর্পূরা, ঠুটাপাইকার, গোড়াইপিয়ার, শেখেরটেক, পাকার মাথা, দড়ি কিশোর পুর, বামনপাড়া, লাল মসজিদ, কুমারপাড়া, ভেন্ডারপাড়া, ফকিরপাড়া, মাঝিপাড়া, পশ্চিম বজরা, চর বজরা, বাঁধের মাথা, উত্তর সাদুয়া দামার হাট, খামার দামারহাট নদীর পশ্চিমপাড়, সাতালস্ক, চর বজরা, সন্তোষ অভিরাম, কাজিরচক সহ অন্যান্য এলাকা ভাঙন হিসাবে চিহ্নিত করে সরকারি ভাবে জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর কাজ করলেও অনেক এলাকায় এখনো ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এসব এলাকায় নতুন করে নদী ভাঙনে একরের পর একর আবাদি জমি, বসতবাড়ি এবং বড় বড় গাছ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নালার চর লাল মসজিদ এলাকায় গত চার দিনে চিস্তার ভাঙনে ৭টি পরিবার নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অপদিকে বসুনিয়াপাড়া এলাকায় কয়েক একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। এসকল এলাকায় তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার চরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ফসলি জমিতে হাঁটু পর্যন্ত পানি উঠেছে। এছাড়া ফসলি জমি তিস্তার পাড়ে থাকায় পাড় ও ফসলি জমিতে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে করে একরকময় একর ফসলি জমি তিস্তার গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া পাড় ভেঙে বাড়ি-ঘর হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। পাড়ের মানুষ জিও ব্যাগ না পেয়ে নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের জঙ্গল, বাঁশ, কলাগাছ ও ছোট বড় গাছ দিয়ে পাড় ভাঙন রোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। একরকম চেষ্টায় ভাঙন রোধ করতে না পেয়ে একর ফসলি জমি বাড়ি-ঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তারা সব হাড়িয়ে উপায় না পেয়ে তারা খোলা আকাশের নীচে কিংবা অন্যের জমিতে বসবাস করে আসছেন। এসময় তারা জানান, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে তীব্র থেকে তীব্রতর ভাঙন দেখা দিবে। যা কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের পাড়ের ফসলি জমি ও বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
ফলে তারা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন দিনের পর দিন। থাকার জায়গা না পেয়ে অন্যের জমিতে কিংবা বাঁধের রাস্তার পাশে এবং খোলা আকাশের নীচে পরিবার নিয়ে দিন পাড় করছেন। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ জীবন বাঁচার তাগিদে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছেন। সন্তানের লেখাপড়ায় নেমে আসে অনিশ্চিয়তা। তাই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা পুনর্বাসন সহ ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধান চায়।
উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের পাকারমাথা শেখেরটেক এলাকার মফিল উদ্দিন বলেন, চরের নিম্নাঞ্চল এলাকায় প্রায় এক একর জমিতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আমন চাষ করছেন। আর মাত্র কয়েকদিন পরে ধান মাড়াই করে ঘরে নিয়ে আসবেন। তিস্তার উজানি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জমিতে এক হাঁটু পানির নিচে তলে গেছে। ওই জমি তিস্তার পাড়ে থাকায় নদীতে ভেঙে যাচ্ছে। উপায় না পেয়ে অপরিপক্ক ধান কেটে নিয়ে আসছেন। ধান মাড়াই করার স্বপ্ন ভেঙে এখন তিস্তার গর্ভে।
উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়ন তিস্তা নদী বেষ্টিত নালার চর লাল জুম্মাপাড় এলাকার ছকিনা বেগম (৬২) জানান, গত এক সপ্তাহে আমাদের এখান থেকে ৭টি পরিবার নদীতে ভেঙে গেছে। আজকের নতুন করে ভাঙনে এ এলাকার মানুষ দিশেহারা হয়ে গেছে। নদীতে পানি বাড়ার সাথে সাথে এখানে ভাঙন বৃদ্ধি পেয়েছে। জিও ব্যাগ চাই পাইনা, তারা বলে এ বছরের বরাদ্দ শেষ। আমাদের বাঁচার উপায় নেই।
এদিকে বসুনিয়া পাড়া এলাকার মঞ্জু মিয়া, রেজিয়া খাতুন, বজরুল ইসলাম, ও জহুরুল ইসলাম সহ আরও অনেকে বলেন, গত কয়েকদিনের ভাঙনে ফসলি জমি ঘর-বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। এসকল এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। হঠাৎ তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আরও বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের এলাকা বিলীন হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, বৃষ্টি ও উজানি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিপদসিমার ২১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তার চরের নিম্নাঞ্চল গুলোতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া তিব্র স্রোতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিস্তার ভাঙন কবলিত এলাকা গুলো ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এবছর জিও ব্যাগের বরাদ্দ শেষ হওয়ায় ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে জিও ব্যাগের চাহিদা পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বরাদ্দ চলে আসলে ভাঙন রোধে কাজ করা হবে বলে জানান তিনি।
মোঃ রেজাউল ইসলাম স্টাফ রিপোর্টার 



















