ঢাকা ০৪:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুড়িগ্রাম সদরে প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ, নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের অন্তঃউপজেলা বদলিতে নীতিমালা লঙ্ঘন ও তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। টাকার বিনিময়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষক বদলি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষক নেতৃবৃন্দ। বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্র ও আদেশ যাচাই করে একাধিক ক্ষেত্রে নীতিমালা লঙ্ঘনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান লোকজন নিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসে যান। সেখানে তিনি শিক্ষা কর্মকর্তাকে চাপ প্রয়োগ করে বদলির তালিকা পরিবর্তন করতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাহবুবুর রহমান।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক রাজনৈতিক ‘চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে’ নীতিমালা ভেঙে বদলি করার অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তবে কারা তাকে চাপ প্রয়োগ করেছেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’ বদলির আদেশ জারি করে। কমিটির সভাপতি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সদস্য সচিব উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
সদরের ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদে বদলির জন্য ৪৩ জন শিক্ষক আবেদন করেন। শুধু শূন্য পদের বিপরীতেই এসব আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল। আবেদনের শেষ সময় ছিল সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা।
কিন্তু বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্র ও আদেশ যাচাই করে দেখা গেছে, ১২ জন শিক্ষককে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জনের বদলির ক্ষেত্রে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি আবেদনের সময় শেষ হওয়ার পর তালিকা পরিবর্তন করে নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে।
শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের পাঁচটি নির্দেশনার মধ্যে চারটিই লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শূন্য পদের বিপরীতে বদলির নির্দেশনা থাকলেও প্রকাশিত তালিকায় শূন্য পদ নেই—এমন বিদ্যালয়েও শিক্ষক বদলি করা হয়েছে। লঙ্ঘন করা হয়েছে জ্যেষ্ঠতার ক্রম। এমনকি আবেদন করেননি—এমন শিক্ষককেও বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব বিদ্যালয়ে পাঁচ বা তার কম সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন, সেসব বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি করা যাবে না। অভিযোগ রয়েছে, বদলির ক্ষেত্রেও এ নির্দেশনা মানা হয়নি।
বদলির আদেশ বিশ্লেষণে দেখা যায়, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে চার শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আবেদন না করেও একজন শিক্ষক বদলির সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া শূন্য পদ নেই এবং আবেদনকারীর পছন্দক্রমেও নাম নেই—এমন বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে।
বদলি তালিকার ২ নম্বর ক্রমে থাকা শিক্ষক বাশিরুল মুমিন খন্দকারকে দুই শিক্ষকের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ৩ নম্বর ক্রমিকে থাকা রোখসানা পারভীনকে তিনজনের, ৪ নম্বর তালিকায় থাকা পাপড়ী রানীকে ছয়জনের এবং ৮ নম্বর ক্রমিকে থাকা ফরিদা বেগমকে সর্বোচ্চ ১০ জনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে নথিপত্রে দেখা গেছে।
অন্যদিকে, তালিকার ১০ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক আব্দুর রহিমকে সদরের পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত শূন্য পদের তালিকায় ওই বিদ্যালয়ের নাম ছিল না। এমনকি আব্দুর রহিমের বদলির পছন্দক্রমেও বিদ্যালয়টির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ১২ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক মাহমুদা আক্তারকে নিয়ে। তিনি বদলির জন্য কোনো আবেদনই করেননি। প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রকাশিত ৪৩ আবেদনকারীর তালিকাতেও তার নাম ছিল না। অথচ চূড়ান্ত বদলি তালিকায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আবেদন গ্রহণের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর তালিকা পরিবর্তন করে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
শিক্ষক নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, বদলি প্রক্রিয়ায় নীতিমালা, জ্যেষ্ঠতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নীতিমালা অনুযায়ী বদলি প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভেড়ামারায় অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের দায়ে ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড

কুড়িগ্রাম সদরে প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ, নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ

আপডেট সময় : ১১:৪০:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের অন্তঃউপজেলা বদলিতে নীতিমালা লঙ্ঘন ও তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। টাকার বিনিময়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষক বদলি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষক নেতৃবৃন্দ। বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্র ও আদেশ যাচাই করে একাধিক ক্ষেত্রে নীতিমালা লঙ্ঘনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান লোকজন নিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসে যান। সেখানে তিনি শিক্ষা কর্মকর্তাকে চাপ প্রয়োগ করে বদলির তালিকা পরিবর্তন করতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাহবুবুর রহমান।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক রাজনৈতিক ‘চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে’ নীতিমালা ভেঙে বদলি করার অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তবে কারা তাকে চাপ প্রয়োগ করেছেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’ বদলির আদেশ জারি করে। কমিটির সভাপতি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সদস্য সচিব উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
সদরের ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদে বদলির জন্য ৪৩ জন শিক্ষক আবেদন করেন। শুধু শূন্য পদের বিপরীতেই এসব আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল। আবেদনের শেষ সময় ছিল সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা।
কিন্তু বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্র ও আদেশ যাচাই করে দেখা গেছে, ১২ জন শিক্ষককে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জনের বদলির ক্ষেত্রে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি আবেদনের সময় শেষ হওয়ার পর তালিকা পরিবর্তন করে নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে।
শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের পাঁচটি নির্দেশনার মধ্যে চারটিই লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শূন্য পদের বিপরীতে বদলির নির্দেশনা থাকলেও প্রকাশিত তালিকায় শূন্য পদ নেই—এমন বিদ্যালয়েও শিক্ষক বদলি করা হয়েছে। লঙ্ঘন করা হয়েছে জ্যেষ্ঠতার ক্রম। এমনকি আবেদন করেননি—এমন শিক্ষককেও বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব বিদ্যালয়ে পাঁচ বা তার কম সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন, সেসব বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি করা যাবে না। অভিযোগ রয়েছে, বদলির ক্ষেত্রেও এ নির্দেশনা মানা হয়নি।
বদলির আদেশ বিশ্লেষণে দেখা যায়, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে চার শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আবেদন না করেও একজন শিক্ষক বদলির সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া শূন্য পদ নেই এবং আবেদনকারীর পছন্দক্রমেও নাম নেই—এমন বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে।
বদলি তালিকার ২ নম্বর ক্রমে থাকা শিক্ষক বাশিরুল মুমিন খন্দকারকে দুই শিক্ষকের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ৩ নম্বর ক্রমিকে থাকা রোখসানা পারভীনকে তিনজনের, ৪ নম্বর তালিকায় থাকা পাপড়ী রানীকে ছয়জনের এবং ৮ নম্বর ক্রমিকে থাকা ফরিদা বেগমকে সর্বোচ্চ ১০ জনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে নথিপত্রে দেখা গেছে।
অন্যদিকে, তালিকার ১০ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক আব্দুর রহিমকে সদরের পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত শূন্য পদের তালিকায় ওই বিদ্যালয়ের নাম ছিল না। এমনকি আব্দুর রহিমের বদলির পছন্দক্রমেও বিদ্যালয়টির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ১২ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক মাহমুদা আক্তারকে নিয়ে। তিনি বদলির জন্য কোনো আবেদনই করেননি। প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রকাশিত ৪৩ আবেদনকারীর তালিকাতেও তার নাম ছিল না। অথচ চূড়ান্ত বদলি তালিকায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আবেদন গ্রহণের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর তালিকা পরিবর্তন করে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
শিক্ষক নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, বদলি প্রক্রিয়ায় নীতিমালা, জ্যেষ্ঠতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নীতিমালা অনুযায়ী বদলি প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।