ঢাকা ০২:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনী প্রচারণার নিচে চাপা পড়েছে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’

 

 

​যে রক্তাক্ত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা, সেই ঐতিহাসিক বিপ্লবের স্মারকটিই এখন ঢেকে গেছে ভোটের প্রচারণার ভিড়ে। ঠাকুরগাঁও শহরের পুরোনো বাসস্ট্যান্ড মোড়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’টি রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যানার ও বিলবোর্ডে পুরোপুরি আড়াল হয়ে পড়েছে। শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত স্মারক ঢেকে এভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোয় স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
​রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া-ভূল্লী) আসনটি খালি ঘোষণা করলে নির্বাচন কমিশন ২২ আগস্ট আসনটি শূন্য ঘোষণা করে। আগামী ২৯ অক্টোবর এই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রতীক বরাদ্দের পর গত বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেন প্রার্থীরা। এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম প্রার্থীদের মাঝে নির্বাচনী প্রতীক বণ্টন করেন।
​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার গভীর রাতে বিএনপির সমর্থকেরা শহরের প্রধান রাস্তা ও মোড়গুলোতে প্রচার সামগ্রী টাঙানো শুরু করেন। একই সাথে পুরোনো বাসস্ট্যান্ড গোলচত্বরেও ব্যানার টাঙানো হলে স্মৃতিস্তম্ভটির কিছু অংশ ঢেকে যায়। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার রাতে জামায়াত কর্মীরা বাকি ফাঁকা অংশটিতে ব্যানার ও বড় বড় বিলবোর্ড বসান। ফলে স্মৃতিস্তম্ভটি প্রায় পুরোপুরি দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
​এই উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।
​উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আহত ও শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে ৬৪টি জেলায় একই নকশায় এই স্মৃতিস্তম্ভগুলো নির্মাণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এসব স্মারকে খোদাই করা রয়েছে আন্দোলনের নানা স্লোগান, কবিতা ও চিত্রকর্ম, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ইতিহাস জানতে পারে।
​স্থানীয় ও সচেতন মহলের প্রতিক্রিয়া
​জুলাই আন্দোলনের স্থানীয় কর্মী আহছানুল হাবিব বলেন, “এই স্তম্ভটি আমাদের সেই আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতি বহন করে। যারা এটিকে আড়াল করেছেন, তাদের বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।”
​তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির স্থানীয় প্রতিনিধি মাহবুব আলম বলেন, “নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা প্রায়শই জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে কথা বলেন। অথচ তাদের প্রচারণাতেই স্মারকটি ঢেকে দেওয়া হলো, যা প্রত্যাশিত নয়। অবিলম্বে ব্যানার-বিলবোর্ড সরিয়ে স্তম্ভটি উন্মুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
​সাংস্কৃতিক কর্মী আব্দুল্লাহ আল মামুন মন্তব্য করেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণার প্রতিযোগিতায় যখন পুরো শহর ছেয়ে গেছে, তখন স্মৃতিস্তম্ভটি ঢেকে যাওয়া আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শহীদদের স্মৃতি রক্ষা করা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।”
​রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের বক্তব্য
​জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক আহমেদুর রহমান কাজল জানান, “জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। কর্মীরা বুঝতে না পেরে সেখানে ব্যানার টাঙিয়েছিল, তবে তখনও স্তম্ভটির অনেকটা অংশ দেখা যাচ্ছিল। পরবর্তীতে জামায়াত বাকি খালি জায়গায় নিজেদের ব্যানার-বিলবোর্ড লাগিয়ে সেটি সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়।”
​জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শাহজালাল জুয়েল বলেন, “স্থানস্বল্পতার কারণে কর্মীরা এমনটি করেছেন। অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে; ধানের শীষের ব্যানার সরানো হলে আমরাও আমাদের ব্যানার ও বিলবোর্ড সরিয়ে নেব।”
​ঘটনা প্রসঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। তবে এ বিষয়ে সকলের আরও সংবেদনশীল ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশ থেকে সব ধরণের ব্যানার-বিলবোর্ড অপসারণ করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”

জনপ্রিয় সংবাদ

বকশীগঞ্জে মাদকসহ আটক, যুবকের ৬ মাসের কারাদণ্ড

নির্বাচনী প্রচারণার নিচে চাপা পড়েছে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’

আপডেট সময় : ১২:৫৭:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

 

 

​যে রক্তাক্ত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা, সেই ঐতিহাসিক বিপ্লবের স্মারকটিই এখন ঢেকে গেছে ভোটের প্রচারণার ভিড়ে। ঠাকুরগাঁও শহরের পুরোনো বাসস্ট্যান্ড মোড়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’টি রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যানার ও বিলবোর্ডে পুরোপুরি আড়াল হয়ে পড়েছে। শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত স্মারক ঢেকে এভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোয় স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
​রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া-ভূল্লী) আসনটি খালি ঘোষণা করলে নির্বাচন কমিশন ২২ আগস্ট আসনটি শূন্য ঘোষণা করে। আগামী ২৯ অক্টোবর এই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রতীক বরাদ্দের পর গত বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেন প্রার্থীরা। এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম প্রার্থীদের মাঝে নির্বাচনী প্রতীক বণ্টন করেন।
​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার গভীর রাতে বিএনপির সমর্থকেরা শহরের প্রধান রাস্তা ও মোড়গুলোতে প্রচার সামগ্রী টাঙানো শুরু করেন। একই সাথে পুরোনো বাসস্ট্যান্ড গোলচত্বরেও ব্যানার টাঙানো হলে স্মৃতিস্তম্ভটির কিছু অংশ ঢেকে যায়। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার রাতে জামায়াত কর্মীরা বাকি ফাঁকা অংশটিতে ব্যানার ও বড় বড় বিলবোর্ড বসান। ফলে স্মৃতিস্তম্ভটি প্রায় পুরোপুরি দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
​এই উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।
​উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আহত ও শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে ৬৪টি জেলায় একই নকশায় এই স্মৃতিস্তম্ভগুলো নির্মাণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এসব স্মারকে খোদাই করা রয়েছে আন্দোলনের নানা স্লোগান, কবিতা ও চিত্রকর্ম, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ইতিহাস জানতে পারে।
​স্থানীয় ও সচেতন মহলের প্রতিক্রিয়া
​জুলাই আন্দোলনের স্থানীয় কর্মী আহছানুল হাবিব বলেন, “এই স্তম্ভটি আমাদের সেই আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতি বহন করে। যারা এটিকে আড়াল করেছেন, তাদের বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।”
​তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির স্থানীয় প্রতিনিধি মাহবুব আলম বলেন, “নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা প্রায়শই জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে কথা বলেন। অথচ তাদের প্রচারণাতেই স্মারকটি ঢেকে দেওয়া হলো, যা প্রত্যাশিত নয়। অবিলম্বে ব্যানার-বিলবোর্ড সরিয়ে স্তম্ভটি উন্মুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
​সাংস্কৃতিক কর্মী আব্দুল্লাহ আল মামুন মন্তব্য করেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণার প্রতিযোগিতায় যখন পুরো শহর ছেয়ে গেছে, তখন স্মৃতিস্তম্ভটি ঢেকে যাওয়া আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শহীদদের স্মৃতি রক্ষা করা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।”
​রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের বক্তব্য
​জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক আহমেদুর রহমান কাজল জানান, “জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। কর্মীরা বুঝতে না পেরে সেখানে ব্যানার টাঙিয়েছিল, তবে তখনও স্তম্ভটির অনেকটা অংশ দেখা যাচ্ছিল। পরবর্তীতে জামায়াত বাকি খালি জায়গায় নিজেদের ব্যানার-বিলবোর্ড লাগিয়ে সেটি সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়।”
​জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শাহজালাল জুয়েল বলেন, “স্থানস্বল্পতার কারণে কর্মীরা এমনটি করেছেন। অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে; ধানের শীষের ব্যানার সরানো হলে আমরাও আমাদের ব্যানার ও বিলবোর্ড সরিয়ে নেব।”
​ঘটনা প্রসঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। তবে এ বিষয়ে সকলের আরও সংবেদনশীল ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশ থেকে সব ধরণের ব্যানার-বিলবোর্ড অপসারণ করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”