যান্ত্রিকতার শহরে এক টুকরো সবুজ ফিটনেস স্বর্গ
রাসেল চৌধুরী :
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। চাটগাঁর আকাশ জুড়ে কেবল আলতো কুয়াশার চাদর। শহরের মোড়ে মোড়ে যখন কেবল দু-একটা রিকশার চাকা ঘুরতে শুরু করেছে, তখনই সিআরবি আর নন্দনকাননের মোড় পেরিয়ে মানুষের স্রোত ছুটছে এক চিলতে সবুজের পানে। ইট-কাঠ-কংক্রিটের এই ব্যস্ত বাণিজ্যিক নগরীর বুক চিরে জেগে থাকা ঐতিহ্যবাহী ডিসি হিল (নজরুল স্কয়ার) যেন প্রতিদিন ভোরে রূপ নেয় এক জীবন্ত ফিটনেস স্বর্গে। গাড়ির হর্ন, কালো ধোঁয়া আর কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি মুছতে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে এটি কেবল আর দশটা সাধারণ পার্কের মতো শুধু প্রাতঃভ্রমণের জায়গা নয়; ডিসি হিল এখন চাটগাঁবাসীর ফুসফুস আর এক অন্যন্য উন্মুক্ত জিমনেসিয়াম।
যাঁরা আধুনিক এসি জিমের চার দেয়াল, কৃত্রিম আলো আর যান্ত্রিক ট্রেডমিল পছন্দ করেন না, তাঁদের জন্য ডিসি হিল এক পরম আশ্রয়। শতবর্ষী রেইনট্রি ও মেহগনি গাছের ছায়া, পাখির কলকাকলি আর পাহাড়ের খাঁটি বাতাস বুকে নিয়ে এখানে চলে শরীরচর্চা। কৃত্রিম ফ্যানের বাতাস নয়, বরং প্রকৃতির নিখাদ অক্সিজেন গায়ে মেখে এখানকার ব্যায়ামবিদরা খুঁজে পান এক অনন্য শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি। পাহাড়ের গা বেয়ে তৈরি হওয়া আঁকাবাঁকা ও ঢালু পথগুলো যেন কোনো যান্ত্রিক ট্রেডমিলের চেয়েও বেশি কার্যকর শরীরকে সচল ও প্রাণবন্ত রাখতে।
ডিসি হিলের ভোরের মূল চালিকাশক্তি হলো এখানকার স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ব্যায়াম ও স্বাস্থ্য সচেতন ক্লাবগুলো। কেবল একা একা হাঁটা নয়, বরং সংঘবদ্ধভাবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সুস্বাস্থ্যের চর্চা করাই এই ক্লাবগুলোর উদ্দেশ্য।
ডিসি হিলের সবচেয়ে পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী একটি সংগঠন হলো ‘শতায়ু অঙ্গন’। কয়েক শ প্রবীণ ও মধ্যবয়সী সদস্যের এই সংগঠনে প্রতিদিন ভোরে সুশৃঙ্খলভাবে দলগত মুক্তহস্ত ব্যায়াম করানো হয়। অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের হাততালি আর হুইসেলের তালে তালে এখানে চলে স্ট্রেচিং, পিটি এবং কার্ডিও কসরত।
একই সাথে পাহাড়ের মুক্ত চত্বরে দেখা মেলে ‘ডিসি হিল ইয়োগা সোসাইটি’-এর সদস্যদের। যেখানে অত্যন্ত শান্ত ও ধীর পরিবেশে ধ্যান, প্রাণায়াম এবং কঠিন সব আসন চর্চার মাধ্যমে মন ও শরীরকে শুদ্ধ করার এক নীরব প্রয়াস চলে। আবার তরুণদের প্রাণচঞ্চলতায় মুখর থাকে ‘চট্টগ্রাম রানার্স ক্লাব’ কিংবা বিভিন্ন ইনফরমাল ক্যালিস্তেনিকস গ্রুপ, যারা পাহাড়ের ঢালু পথ বেয়ে দ্রুত দৌড়ানো এবং শরীরের নিজস্ব ওজন ব্যবহার করে কঠিন সব পুশ-আপ কিংবা পুল-আপের কসরত করে।
ডিসি হিলের ভোরের চিত্রটি এক কথায় অদ্ভুত সুন্দর ও বৈচিত্র্যময়। এখানে কোনো বয়সের কড়াকড়ি নেই। তরতাজা তরুণ থেকে শুরু করে সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিক—সবাই মেতে ওঠেন সুস্বাস্থ্যের আবাহনে। কেউ করছেন পাওয়ার ওয়াকিং (দ্রুত হাঁটা), কেউবা মেতেছেন জগিংয়ে। নারীরা দলবেঁধে যেমন হাঁটছেন, পুরুষেরা তেমনি মাঠের এক কোণে গোল হয়ে অংশ নিচ্ছেন কঠিন সব শারীরিক কসরতে। যুগের পর যুগ ধরে এটি যেন চট্টগ্রামের সুস্থ জীবনধারার এক অলিখিত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ডিসি হিলের এই ভোরের ব্যায়াম কেবল মেদ ঝরানো বা শরীর গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি রূপ নিয়েছে এক গভীর সামাজিক মেলবন্ধনে। প্রতিদিন ভোরে দেখা হতে হতে এই ক্লাবগুলোর মাধ্যমে সদস্যদের মাঝে তৈরি হয়েছে পারিবারিক হৃদ্যতা। ব্যায়াম শেষ করে পাহাড়ের চূড়ায় বা নজরুল মঞ্চের সিঁড়িতে গোল হয়ে বসে চলে কুশল বিনিময়, চায়ের কাপে চুমুক কিংবা দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখের গল্প। ক্লাবের কোনো সদস্য একদিন ভোরে না এলে অন্য সদস্যরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে বা ফোনে খোঁজ নেন। একে অপরের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর এক চমৎকার মানবিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে এই সবুজ চত্বরে।
শহরের নামী ও আধুনিক জিমগুলোর চড়া মেম্বারশিপ ফি যেখানে মধ্যবিত্ত বা অনেকেরই সাধ্যের বাইরে, সেখানে ডিসি হিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দিচ্ছে ফিট থাকার অফুরন্ত সুযোগ। প্রকৃতির এই উন্মুক্ত জিমনেসিয়ামে যোগ দিতে পকেটের টাকা খরচ করতে হয় না, প্রয়োজন শুধু একটু ইচ্ছাশক্তি আর ভোরে ঘুম থেকে ওঠার সুঅভ্যাস।
ব্যস্ততম এই বাণিজ্যিক নগরীতে ডিসি হিল যেন সুস্থভাবে বেঁচে থাকার এক পরম আশ্রয়। প্রতিদিনের নাগরিক ব্যস্ততা ও মানসিক চাপ ভুলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে শরীর ও মনকে সতেজ রাখতে ডিসি হিলের এই ভোরের আয়োজন সত্যিই ব্যতিক্রমী এবং নগরবাসীর জন্য এক বড় আশীর্বাদ।
ডিসি হিলের স্নিগ্ধ ভোরে সুস্বাস্থ্যের খোঁজে
জনপ্রিয় সংবাদ


























