রাসেল চৌধুরী :
রাজনীতির পিচ্ছিল পথ, একের পর এক রাজনৈতিক মামলা, হুলিয়া আর চিরচেনা মেঠোপথ ছেড়ে ফেরারি জীবন—এই তো আমাদের চেনা ছাত্র রাজনীতির চেনা গল্প। কিন্তু এই চেনা গল্পের ভেতরেও কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে নিজেকে চিনে নেন ‘লড়াকু সৈনিক’ হিসেবে। তেমনই এক তরুণের নাম কামরুল কুতুবী। যিনি শুধু ড্রয়িংরুমের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাজপথে স্বৈরাচার বিরোধী স্লোগানে প্রকম্পিত করেছেন অলিগলি।
তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে নিজের মেধা ও ত্যাগের স্বাক্ষর রেখেছেন। সাবেক এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানের শীর্ষস্থানীয় এই ছাত্রনেতা প্রতিকূল সময়েও হারাননি সাহসের দিশা। যখন বিরোধী মতের রাজনীতি দূর অস্ত, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই ছিল এক অলৌকিক ব্যাপার, সেই রক্তচক্ষু আর দুঃশাসনের চরম অন্ধকার সময়ে, আওয়ামী লীগের অন্যতম ‘আতুরঘর’ এবং রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের ২ নম্বর গেটের মেয়র গলি এলাকায় দাঁড়িয়ে যিনি বুক টান করে ছাত্রদলের রাজনীতি সচল রেখেছিলেন—তিনি কামরুল কুতুবী।

এই লড়াকু ছাত্রনেতার জন্ম ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই, দেশের ঐতিহ্যবাহী পর্যটন নগরী কক্সবাজার জেলার কুতুবদীয়ায়। এক সম্ভ্রান্ত ও রাজনৈতিক সচেতন মুসলিম পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর বাবা প্রবাসী মোহাম্মদ হোসেন কুতুবী সুদীর্ঘ সময় ধরে প্রবাসে থেকে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন এবং মা হাসিনা বেগম একজন আদর্শ গৃহিণী, যিনি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও সন্তানদের বুকে সাহস জুগিয়েছেন। দুই ভাই ও দুই বোনের সাজানো পরিবারে কামরুল কুতুবী পারিবারিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের দীক্ষা নিয়েই বড় হয়েছেন।
গল্পটার শুরু ২০১০ সালেরও কিছু আগে। তখন তিনি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। কুতুবদিয়ায় জন্ম নেওয়া এই কিশোরের মন জুড়ে তখনো রাজনীতির মারপ্যাঁচ বসেনি। ঠিক সেই সময়ে কুতুবদিয়ায় এক প্রতিনিধি সমাবেশে এসেছিলেন বিএনপির তৎকালীন তরুণ ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
হাজারো মানুষের ভিড়ে সেই কিশোর কামরুল কুতুবীর সৌভাগ্য হয়েছিল প্রিয় নেতাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়ার। সেই যে নেতার চোখের ভাষা, ভালোবাসা আর দেশনেত্রী ও তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ বুকে গেঁথেছিল, তা আর কোনো ঝড়-ঝাপটায় মুছে যায়নি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কালজয়ী দর্শনকে মনে-প্রাণে ধারণ করেই শুরু হয় তাঁর এই দুর্গম পথচলা।

এসএসসি শেষ করে ২০১০ সালে যখন কামরুল কুতুবী চট্টগ্রামে পা রাখেন, তখন রাজনীতি এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের অন্যতম ‘আতুরঘর’ হিসেবে পরিচিত ছিল ২ নম্বর গেটের মেয়র গলি এলাকা। সেখানেই বসবাস শুরু করেন কামরুল। বৈরী পরিবেশ, প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরা আতঙ্ক আর প্রতিপক্ষের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে বিএএফ শাহীন কলেজ এবং হাজেরা-তাজু ডিগ্রি কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি প্রতিপক্ষের প্রধান টার্গেটে পরিণত হন। পরবর্তীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে একনিষ্ঠ সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করেন।
প্রতিনিয়ত হুলিয়া, মাঝরাতে দরজায় পুলিশের করাঘাত, আর প্রতিপক্ষের ক্যাডারদের প্রাণনাশের হুমকি ছিল কামরুল কুতুবীর নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু বুকভরা জাতীয়তাবাদী আদর্শ এবং শৈশবে তারেক রহমানের হাত থেকে পাওয়া ফুলের সেই স্পর্শ তাঁকে একচুলও দমাতে পারেনি। চরম প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি গোপনে ও প্রকাশ্যে ছাত্রদলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন।
যখন আওয়ামী দুঃশাসনের ভয়ে দলের অনেক চেনা মুখও গা-ঢাকা দিয়েছিলেন, তখন কামরুল কুতুবী এক ব্যতিক্রমধর্মী কৌশলে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। ২০১০ সাল থেকেই তিনি চট্টগ্রামের রাজপথের ভবঘুরে, অনাথ ও সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের আপন করে নেন। মেয়র গলি ও এর আশপাশের অবহেলিত শিশুদের জন্য তিনি গড়ে তোলেন এক মানবিক দেয়াল।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার মূল ধারায় ফেরাতে তিনি নিজের পকেটের টাকা বাঁচিয়ে বই, খাতা, কলম ও পেন্সিল বিতরণ শুরু করেন। অনেক শিশুর স্কুলের ভর্তির দায়িত্বও নেন তিনি। অর্থাভাবে যে শিশুরা ধুঁকে ধুঁকে মরছিল, তাদের জন্য কামরুল বিভিন্ন চিকিৎসকের সহায়তায় বিনামূল্যে ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করেন। করোনাকালীন দুঃসময়েও তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই শিশুদের দুয়ারের খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দিয়েছেন।
প্রতি বছর যেখানে বিত্তবানদের সন্তানরা দামি মাঠে খেলাধুলা করে, সেখানে কামরুল কুতুবী চট্টগ্রামের বিভিন্ন খোলা মাঠে এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে আয়োজন করতেন বিশেষ ‘ক্রীড়া উৎসব’। ফুটবল টুর্নামেন্ট, বুট জুতো ছাড়াই মেঠোপথে দৌড় প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে নানা খেলার আয়োজন করে তিনি এই অবহেলিত শিশুদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। খেলা শেষে নিজ হাতে পুরস্কার তুলে দিতেন তাদের হাতে।

রাজনীতির হিংস্র ময়দানে থেকে এমন নরম মনের মানবিক কাজ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মহলে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। প্রতিপক্ষের লোকেরাও কামরুলের এই শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও মানবিক কাজের কারণে মনে মনে তাঁর প্রতি এক ধরণের সমীহ পোষণ করত।
রাজনীতি আর পথশিশুদের সেবার পাশাপাশি কামরুল কুতুবীর চিন্তা জুড়ে রয়েছে সুস্থ ও নৈতিক সমাজ বিনির্মাণ। সেই তাড়না থেকেই তিনি সমাজ সংস্কার ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে নিজেকে যুক্ত করেছেন। তিনি বর্তমানে ইমাম আবু হানিফা দাখিল মাদ্রাসার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
আওয়ামী দুঃশাসনের চরম বৈরী সময়েও তিনি এই দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির হাল ছাড়েননি। সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি মাদ্রাসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গরিব ও এতিম শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থা এবং আধুনিক যুগোপযোগী কম্পিউটার শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছেন। মাদ্রাসাটির শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং একদল সৎ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলাই এখন তাঁর অন্যতম প্রধান ব্রত।
এই দীর্ঘ লড়াইয়ের চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা আসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে কামরুল কুতুবী ঘর ছেড়ে নেমে আসেন রাজপথের সম্মুখ সমরে। জুলাইয়ে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে যখন ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ছাত্র হত্যার উৎসব চলছিল, যখন রাব্বিসহ অসংখ্য তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছিল, তখনো কামরুল ছিলেন মিছিলের একদম সামনে।
৪ ও ৫ আগস্ট চট্টগ্রামের রাস্তায় যখন বৃষ্টির মতো গুলি চলছিল, তখনো তিনি মাঠ ছাড়েননি। সহযোদ্ধারা যখন একের পর এক লুটিয়ে পড়ছিলেন, তখনো সাহসের দিশা হারাননি এই তরুণ। সেই রক্তের সমুদ্র থেকে সুস্থ শরীরে বেঁচে ফেরাকে তিনি স্রেফ অলৌকিক ‘ভাগ্য’ বলে মনে করেন।

বর্তমানে মাদ্রাসা এবং সামাজিক শিক্ষার প্রসারে নিরলস কাজ করে যাওয়ার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জুড়ে রয়েছে তাঁর নাড়িপোঁতা মাটি—কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলা। অবহেলিত এই উপকূলীয় ও দ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যবদল এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য।
ভবিষ্যতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি মানুষের সেবার করার উদ্দেশ্যে তিনি মহেশখালী-কুতুবদিয়া অঞ্চল থেকে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ক্ষমতার মোহে অন্ধ না হয়ে, তৃণমূলের মানুষের ঘরে ঘরে আইনি ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করাই তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনীতির মূল ইশতেহার। কামরুল কুতুবী প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা বা দখলদারিত্ব নয়; চরম স্বৈরাচারের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েও বুক পকেটে মানবতাবোধ বাঁচিয়ে রাখার নামই প্রকৃত রাজনীতি। চব্বিশের নতুন বাংলাদেশে এই মানবিক ও সাহসী তরুণেরাই এখন দেশের মূল কাণ্ডারি।














