রাসেল চৌধুরী
নজিরবিহীন পটপরিবর্তন এবং পরবর্তীতে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকার যখন প্রশাসন ও অর্থনৈতিক খাতগুলোকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ধারায় ফেরানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান—সবখানেই এক অলিখিত দিনক্ষণ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে, আর তা হলো ‘ডিসেম্বর’। সাধারণ মানুষের মনে সুপ্ত এক কৌতূহল, বছরের শেষ মাসটিতে কি আসলেই নতুন কোনো মোড় নিতে যাচ্ছে দেশের পরিস্থিতি, নাকি এটি কেবলই ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া শিবিরের এক চতুর মনস্তাত্ত্বিক চাল।
মাঠের বাস্তব চিত্র, প্রশাসনিক গোয়েন্দা তৎপরতা এবং বিভিন্ন শিবিরের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে এই ‘ডিসেম্বর ধোঁয়াশা’র নেপথ্যে কিছু গভীর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে নির্বাচনে পরাজয়ের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রায় পুরো কাঠামো এখন ছত্রভঙ্গ। শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত কর্মীরা চরম অস্তিত্ব ও নেতৃত্ব সংকটে ভুগছেন। এই পরিস্থিতিতে দলটির একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে ‘ডিসেম্বর থিওরি’ ভাসিয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বাস্তবসম্মত মাঠের রণকৌশল বা শক্তির মহড়া নয়, বরং ঘরবন্দি ও আত্মগোপনে থাকা কর্মীদের मानসিকভাবে বাঁচিয়ে রাখার একটা শেষ চেষ্টা। কর্মীদের এক ধরনের অলীক আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে যে—‘আর মাত্র কয়েকটা মাস, তারপরই বড় পরিবর্তন।’ এর মূল উদ্দেশ্য, নতুন সরকারকে সার্বক্ষণিক একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে রাখা এবং এক ধরনের কৃত্রিম অনিশ্চয়তা জিইয়ে রাখা।
এই ডিসেম্বর তত্ত্বের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি ডালপালা মেলছে, তা হলো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি। বিশেষ করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, ৫ আগস্টের পর আঞ্চলিক রাজনীতিতে যে বড় ধাক্কা লেগেছে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তা খুব সহজে মেনে নেয়নি। ঢাকায় নতুন সরকারের নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মেরুকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্বশক্তিগুলো। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ডিসেম্বরের শীতকালীন পরিবেশ ও দেশের ভেতরের যেকোনো ছোটখাটো ইস্যুকে পুঁজি করে বাইরের কিছু লবিস্ট গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালাতে পারে। ফলে, সরকারের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র—উভয় নীতিতেই এখন এই আন্তর্জাতিক প্রভাবের দিকটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মোকাবিলা করা হচ্ছে।
ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে এই আলোচনার আরেকটি বড় কারণ হলো—সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বছরের শেষভাগেই বর্তমান ক্ষমতাসীনদের আমলের প্রথম স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যেই তৃণমূল পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। রাজনীতি বোদ্ধাদের ধারণা, এই স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যায়ে দলের একাধিক জনপ্রিয় প্রার্থীর মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, সেটিকে পুঁজি করে কোনো তৃতীয় পক্ষ যেন কোন্দল বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেটাই এখন সরকারের জন্য বড় প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা। এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টিকেই অনেকে ভুল ব্যাখ্যা করে ‘ডিসেম্বরের অস্থিরতা’ হিসেবে ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
সবচেয়ে বড় বাস্তবতার মুখোমুখি দেশের সাধারণ নাগরিকেরা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বাজার পরিস্থিতির ধকল সামলে সাধারণ মানুষ এখন যেকোনো ধরনের নতুন ‘গুঞ্জন’ বা ‘ডেডলাইন’ শুনলেই আতঙ্কিত বোধ করে। দেশ যখন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে একটি স্বাভাবিক ধারায় ফেরার চেষ্টা করছে, তখন এই ধরনের কৃত্রিম ধোঁয়াশা ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের স্বাভাবিক গতিকে কিছুটা হলেও শ্লথ করে দেয়। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, শীতের কুয়াশা বা বছরের শেষভাগের সুযোগ নিয়ে কাউকেই জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে দেওয়া হবে না। যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা রুখতে গোয়েন্দা নজরদারি এখন থেকেই জোরদার করা হয়েছে।
ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিসেম্বর সব সময়ই এক গভীর আবেগের মাস। তবে এবারের ডিসেম্বরটি কি শুধুই একটা শান্ত, কনকনে শীতের আমেজ নিয়ে আসবে, নাকি পর্দার আড়ালের কোনো নতুন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সমীকরণকে সামনে আনবে—তা দেখতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে আপাতত মাঠের কঠিন বাস্তবতার চেয়ে চায়ের কাপের ঝড় আর সামাজিক মাধ্যমের দেয়ালগুলোতেই এই ‘ডিসেম্বর মিশন’ বেশি আলোড়ন তুলছে।
ডিসেম্বর’ ধোঁয়াশা: বাতাসে গুঞ্জন, নেপথ্যে কতটুকু বাস্তবতা?
জনপ্রিয় সংবাদ











