ঢাকা ০৫:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লন্ডনে মদের বার কিনে মসজিদ বানালেন রাউজানের জিয়া

  • আপডেট সময় : ০৮:১৭:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
  • 17

নিজস্ব প্রতিবেদক


‎যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনে একটি বহুতল মদের বার কিনে সেটিকে আধুনিক মসজিদ ও মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারে রূপান্তর করেছেন বাংলাদেশী প্রবাসী ব্যবসায়ী মো. জিয়া বিন রাসেল। একসময়ের কোলাহলপূর্ণ মদ্যপানের আড্ডাস্থলটি এখন মুখরিত হচ্ছে নিয়মিত আজান, নামাজ ও পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতে। অসাম্প্রদায়িক ও বহুমাত্রিক এই উদ্যোগের পেছনে একক অর্থায়ন করেছেন চট্টগ্রামের রাউজানের এই সফল উদ্যোক্তা। বর্তমানে এই বহুতল ভবনটির বাজারমূল্য প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ড, বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় ৭৫ কোটি টাকা।


‎জিয়া বিন রাসেলের এই অনন্য কীর্তির খবর তাঁর জন্মভূমি চট্টগ্রামের রাউজানে পৌঁছানোর পর স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আনন্দ ও গর্বের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন এটিই প্রধান আলোচনার বিষয়। রাউজানের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুদূর প্রবাসে গিয়েও নিজের শিকড়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও দেশের নাম উজ্জ্বল করে জিয়া বিন রাসেল পুরো রাউজানবাসীর জন্য পরম সম্মান বয়ে এনেছেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের আকস্মিক বন্যায় ওনার পক্ষ থেকে পাঠানো জরুরি ত্রাণ সহায়তার কথা স্মরণ করে স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি ও বন্যাপীড়িত মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া করছেন।


‎লন্ডনে বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটি এবং সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে এই উদ্যোগ অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভবনটিকে কোনো বাণিজ্যিক লাভজনক কেন্দ্র না বানিয়ে আল্লাহর ঘরে রূপান্তর করায় প্রবাসীরা এটিকে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

‎লন্ডনের বাঙালি কমিউনিটির প্রবীণ মুরব্বি আলহাজ্ব মকসুদ আলী (৬২) তাঁর আবেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা যখন আশির দশকে এই লন্ডনে আসি, তখন চারপাশে শুধু পাব আর ক্লাবের ছড়াছড়ি দেখতাম। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবসময় একটা শঙ্কা কাজ করত। আজ যখন দেখি আমাদেরই এক বাংলাদেশী সন্তান বুক ফুলিয়ে একটা মদের বার কিনে সেটাকে আল্লাহর ঘর বানিয়ে দিল, তখন খুশিতে চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। জিয়া ভাই আমাদের বুকটা গর্বে ভরে দিয়েছেন।”

‎প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তাহমিদ আহমেদ (২৪) বলেন, “এটি কেবল একটি ইবাদতখানা নয়, এটি আমাদের জন্য একটি আধুনিক কমিউনিটি সেন্টার। যেখানে একসময় যুবকেরা মাদকের আড্ডায় ধ্বংস হতো, সেখানে এখন আমরা মননশীল চর্চা ও ইবাদত করতে পারব। জিয়া বিন রাসেলের এই উদ্যোগ আমাদের মতো তরুণদের শিখিয়েছে কীভাবে প্রবাসের মাটিতে থেকেও নিজের শিকড় আর ধর্মকে ধরে রাখতে হয়।”

‎লন্ডনের স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহান এই ত্যাগের বাণিজ্যিক মূল্যায়ন করে বলেন, “লন্ডনে সাড়ে চার মিলিয়ন পাউন্ডের একটা সম্পত্তি দিয়ে যে কেউ অনায়াসে প্রতি মাসে লাখ লাখ পাউন্ড লাভ করতে পারতো। বাণিজ্যিক চিন্তা করলে এটি ছিল সোনার খনি। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি ওনার এই বিশাল ত্যাগকে কুর্নিশ জানাই। এমন সৎ साहस আর উদার মন সবার থাকে না।”


‎জিয়া বিন রাসেলের পরিচয় শুধু এই মসজিদ রূপান্তরের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশ ও বিদেশে নানা সামাজিক ও দাতব্য কাজের সাথে যুক্ত আছেন। বাংলাদেশে ‘হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি’-র অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি প্রতিবন্ধীদের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই মেশিন বিতরণ এবং সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশুদের সম্পূর্ণ ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার খরচ বহন করে আসছেন।

‎আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাঁর মানবিক উদ্যোগের পরিধি বিস্তৃত। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও চরম সংকটে থাকা গাজা এবং সুদানের সাধারণ ও অসহায় মানুষের জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবা, খাদ্য সামগ্রী এবং বিশুদ্ধ খাবার পানির নিয়মিত অর্থায়ন করে চলেছেন এই প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

‎ব্যস্ত ও যান্ত্রিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে রাউজানের সন্তান জিয়া বিন রাসেল প্রমাণ করেছেন, শুধু বিত্ত থাকলেই নয়, মানবতা ও দ্বীনের কল্যাণে কাজ করার জন্য একটি উদার ও ত্যাগের মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। তাঁর এই নীরব ও ধারাবাহিক অবদান বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শহীদ জিয়ার প্রথম মাজারে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির শ্রদ্ধা

লন্ডনে মদের বার কিনে মসজিদ বানালেন রাউজানের জিয়া

আপডেট সময় : ০৮:১৭:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক


‎যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনে একটি বহুতল মদের বার কিনে সেটিকে আধুনিক মসজিদ ও মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারে রূপান্তর করেছেন বাংলাদেশী প্রবাসী ব্যবসায়ী মো. জিয়া বিন রাসেল। একসময়ের কোলাহলপূর্ণ মদ্যপানের আড্ডাস্থলটি এখন মুখরিত হচ্ছে নিয়মিত আজান, নামাজ ও পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতে। অসাম্প্রদায়িক ও বহুমাত্রিক এই উদ্যোগের পেছনে একক অর্থায়ন করেছেন চট্টগ্রামের রাউজানের এই সফল উদ্যোক্তা। বর্তমানে এই বহুতল ভবনটির বাজারমূল্য প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ড, বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় ৭৫ কোটি টাকা।


‎জিয়া বিন রাসেলের এই অনন্য কীর্তির খবর তাঁর জন্মভূমি চট্টগ্রামের রাউজানে পৌঁছানোর পর স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আনন্দ ও গর্বের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন এটিই প্রধান আলোচনার বিষয়। রাউজানের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুদূর প্রবাসে গিয়েও নিজের শিকড়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও দেশের নাম উজ্জ্বল করে জিয়া বিন রাসেল পুরো রাউজানবাসীর জন্য পরম সম্মান বয়ে এনেছেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের আকস্মিক বন্যায় ওনার পক্ষ থেকে পাঠানো জরুরি ত্রাণ সহায়তার কথা স্মরণ করে স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি ও বন্যাপীড়িত মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া করছেন।


‎লন্ডনে বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটি এবং সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে এই উদ্যোগ অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভবনটিকে কোনো বাণিজ্যিক লাভজনক কেন্দ্র না বানিয়ে আল্লাহর ঘরে রূপান্তর করায় প্রবাসীরা এটিকে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

‎লন্ডনের বাঙালি কমিউনিটির প্রবীণ মুরব্বি আলহাজ্ব মকসুদ আলী (৬২) তাঁর আবেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা যখন আশির দশকে এই লন্ডনে আসি, তখন চারপাশে শুধু পাব আর ক্লাবের ছড়াছড়ি দেখতাম। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবসময় একটা শঙ্কা কাজ করত। আজ যখন দেখি আমাদেরই এক বাংলাদেশী সন্তান বুক ফুলিয়ে একটা মদের বার কিনে সেটাকে আল্লাহর ঘর বানিয়ে দিল, তখন খুশিতে চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। জিয়া ভাই আমাদের বুকটা গর্বে ভরে দিয়েছেন।”

‎প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তাহমিদ আহমেদ (২৪) বলেন, “এটি কেবল একটি ইবাদতখানা নয়, এটি আমাদের জন্য একটি আধুনিক কমিউনিটি সেন্টার। যেখানে একসময় যুবকেরা মাদকের আড্ডায় ধ্বংস হতো, সেখানে এখন আমরা মননশীল চর্চা ও ইবাদত করতে পারব। জিয়া বিন রাসেলের এই উদ্যোগ আমাদের মতো তরুণদের শিখিয়েছে কীভাবে প্রবাসের মাটিতে থেকেও নিজের শিকড় আর ধর্মকে ধরে রাখতে হয়।”

‎লন্ডনের স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহান এই ত্যাগের বাণিজ্যিক মূল্যায়ন করে বলেন, “লন্ডনে সাড়ে চার মিলিয়ন পাউন্ডের একটা সম্পত্তি দিয়ে যে কেউ অনায়াসে প্রতি মাসে লাখ লাখ পাউন্ড লাভ করতে পারতো। বাণিজ্যিক চিন্তা করলে এটি ছিল সোনার খনি। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি ওনার এই বিশাল ত্যাগকে কুর্নিশ জানাই। এমন সৎ साहस আর উদার মন সবার থাকে না।”


‎জিয়া বিন রাসেলের পরিচয় শুধু এই মসজিদ রূপান্তরের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশ ও বিদেশে নানা সামাজিক ও দাতব্য কাজের সাথে যুক্ত আছেন। বাংলাদেশে ‘হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি’-র অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি প্রতিবন্ধীদের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই মেশিন বিতরণ এবং সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশুদের সম্পূর্ণ ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার খরচ বহন করে আসছেন।

‎আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাঁর মানবিক উদ্যোগের পরিধি বিস্তৃত। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও চরম সংকটে থাকা গাজা এবং সুদানের সাধারণ ও অসহায় মানুষের জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবা, খাদ্য সামগ্রী এবং বিশুদ্ধ খাবার পানির নিয়মিত অর্থায়ন করে চলেছেন এই প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

‎ব্যস্ত ও যান্ত্রিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে রাউজানের সন্তান জিয়া বিন রাসেল প্রমাণ করেছেন, শুধু বিত্ত থাকলেই নয়, মানবতা ও দ্বীনের কল্যাণে কাজ করার জন্য একটি উদার ও ত্যাগের মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। তাঁর এই নীরব ও ধারাবাহিক অবদান বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।