রাসেল চৌধুরী :
জ্বালানি খাতের সমন্বয়হীনতা আর সঞ্চালন লাইনের ভঙ্গুরতায় এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। একদিকে গ্যাসের অভাবে ঘরের চুলা ও কারখানার চাকা বন্ধ, অন্যদিকে নজিরবিহীন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। এই দ্বিমুখী সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে চিকিৎসা খাতে। আজ শনিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জেনারেটরের সীমিত সক্ষমতার কারণে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও নবজাতক ওয়ার্ডের মতো স্পর্শকাতর বিভাগগুলোতে চিকিৎসকদের মোমবাতি আর মোবাইল ফোনের আলোয় সংকটাপন্ন রোগীদের সেবা দিতে দেখা গেছে।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, দুপুরের দিকে আকস্মিকভাবে পুরো চমেক হাসপাতাল এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আকস্মিক এই ‘ব্ল্যাকআউটে’ হাসপাতালের লিফটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন তলায় রোগীবহন ও জরুরি ওষুধ সরবরাহ থমকে যায়। অপারেশন থিয়েটারগুলোতে চলমান বেশ কয়েকটি অস্ত্রোপচার বিকল্প আলোয় শেষ করতে বাধ্য হন সার্জনরা। আড়াই ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সংযোগ সচল হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, তবে এই দীর্ঘ সময়ে রোগী ও স্বজনদের যে চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা এক নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল।
হাসপাতালের এই সংকটের সমান্তরালে গতরাত থেকে পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে আছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ। পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালীসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় গতরাত থেকে শুরু হওয়া বিদ্যুৎহীন পরিস্থিতি আজ দিন গড়িয়ে রাতেও স্বাভাবিক হয়নি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে থাকা খাবার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বাসাবাড়িতে পানির জন্য তীব্র হাহাকার তৈরি হয়েছে।
এর সাথে যুক্ত হওয়া গ্যাস সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নগরীর সিংহভাগ এলাকায় লাইনের গ্যাসের চাপ একেবারেই না থাকায় দুপুরের রান্না রাতেও করতে পারছেন না গৃহিণীরা। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতেও দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছে গণপরিবহন, যার ফলে সড়কগুলোতে তীব্র গণপরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই শোচনীয় দশা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সমাজিক সংগঠন ‘কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ক্যাব)। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মন্তব্য করেছেন, “চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক হাব বলা হলেও নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলটি সবসময় চরম বৈষম্যের শিকার। চমেক হাসপাতালের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকা স্রেফ অমার্জনীয় অপরাধ। যদি জেনারেটর ব্যাকআপের সঠিক তদারকি না থাকে, তবে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে। জ্বালানি খাতের এই বেহাল দশা প্রশাসনের চরম গাফিলতিরই প্রমাণ।”
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এলএনজি সরবরাহ হ্রাস এবং জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন লাইনের আধুনিকায়ন না করার খেসারত দিচ্ছে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ। শিল্প ও গৃহস্থালিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ দিতে না পারলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) স্থানীয় প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, গ্রিড সাব-স্টেশনে কারিগরি ত্রুটির পাশাপাশি তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, যার বিপরীতে সরবরাহ অর্ধেকেরও কম। ত্রুটি সারিয়ে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে বলে তারা আশ্বাস দিয়েছেন।
অন্ধ গ্রিড ও শুষ্ক পাইপলাইনের জাঁতাকলে জিম্মি চট্টগ্রাম: চমেকে আড়াই ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, রাতভর বিদ্যুৎহীন দক্ষিণ জেলা
জনপ্রিয় সংবাদ











