ঢাকা ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামের সিটি গেইটে চলন্ত গাড়ি থামিয়ে পুলিশ-সোর্স সিন্ডিকেটের বেপরোয়া চাঁদাবাজি: ভুক্তভোগীদের কান্না শুনছে না কেউ

  • আপডেট সময় : ০৪:৩৯:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
  • 23

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

‎ গভীর রাত। অন্ধকারের বুক চিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে ছুটে আসছে একের পর এক পণ্যবাহী ট্রাক ও দূরপাল্লার গাড়ি। চট্টগ্রাম নগরীর প্রবেশদ্বার ‘সিটি গেইট’ এলাকায় আসতেই হঠাৎ লাঠি এবং টর্চলাইট হাতে চলন্ত গাড়ির সামনে লাফিয়ে পড়ল ৩-৪ জন যুবক। চালক সজোরে ব্রেক চাপতেই গাড়িটি ঘিরে ফেলা হলো। যুবকদের কারও গায়ে ইউনিফর্ম নেই, নেই কোনো আইনি পরিচয়পত্র। গাড়ি থামানোর কারণ জানতে চাইতেই চালকের কলার চেপে ধরে হুঙ্কার—“গাড়ি সাইড কর! তল্লাশি হবে। ভেতরে ইয়াবা আছে খবর আছে।”

‎চালকের কপালে তখন উদ্বেগের ঘাম। কারণ তিনি জানেন, এটি কোনো আইনি তল্লাশি নয়; এটি নগরীর সবচেয়ে কুখ্যাত ‘পুলিশ-সোর্স সিন্ডিকেটের’ পাতা ফাঁদ। ঠিক একটু দূরেই অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশের কয়েকজন সদস্য। সোর্সদের সবুজ সংকেত পেলেই তারা এগিয়ে আসেন শিকার ধরতে। চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বারে প্রতিদিন এভাবেই চলছে সাধারণ চালক ও যাত্রীদের পকেট কাটার মহোৎসব। অথচ, এই প্রকাশ্য জুলুমের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব।


‎আইন অনুযায়ী, পুলিশের তথ্যদাতা বা ‘সোর্স’দের কোনো গাড়ি থামানোর, তল্লাশি করার বা সাধারণ মানুষকে আটক করার আইনগত অধিকার নেই। কিন্তু সিটি গেইট এলাকায় এই নিয়ম পুরোপুরি উল্টো। এখানে সোর্সরাই সর্বেসর্বা।

‎অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় আকবর শাহ থানা এবং ট্রাফিক বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এক সোর্স সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা মূলত স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও চিহ্নিত অপরাধী। পুলিশের ‘ক্যাশিয়ার’ বা লাইনম্যান হিসেবে এরা কাজ করে। চলন্ত গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির নামে সময় নষ্ট করা, গাড়ির ভেতরে গোপনে মাদক ঢুকিয়ে দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখানো এবং চালকদের মারধর করা এদের নিত্যদিনের কাজ।


‎রাত ১২টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত সিটি গেইট এলাকায় এই সিন্ডিকেটের তাণ্ডব সবচেয়ে বেশি বাড়ে। দূরপাল্লার ট্রাক, সবজি ও ফলবাহী গাড়ি এবং ব্যক্তিগত প্রাইভেটকারকে টার্গেট করা হয়।

‎ গাড়ি থামিয়েই সোর্সরা কেবিনের ভেতর হাতড়ায়। কিছু না পেলেও দাবি করে, “গাড়িতে অবৈধ মাল আছে।” প্রতিবাদ করলে মাদক মামলায় ফাঁসানোর সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়।

সোর্সরা যখন চালককে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে, তখন দৃশ্যপটে আসেন দায়িত্বরত অসাধু পুলিশ সদস্যরা। তারা কাগজপত্র চেক করার নামে জটিলতা তৈরি করেন এবং স্পটেই মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।

পুলিশের হাতে সরাসরি টাকা লেনদেন হয় না। সোর্স বা তাদের নির্ধারিত ‘লাইনম্যানের’ মাধ্যমে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। টাকা দিলেই কেবল গাড়ি ছাড়পত্র পায়, না দিলে গাড়ি ডাম্পিংয়ের ভয় দেখিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়।


‎গত বুধবার রাতে সিটি গেইটে হয়রানির শিকার এক কাঁচামাল ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমার ট্রাকে পচনশীল সবজি ছিল। সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও সোর্সরা গাড়ি থামিয়ে ৩ হাজার টাকা দাবি করে। পুলিশকে বললাম স্যার আমার সব ঠিক আছে, পুলিশ বলল—সোর্সরা বলছে গাড়ি চেক করতে হবে, টাকা দিয়ে ঝামেলা মেটান। সবজি নষ্ট হওয়ার ভয়ে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি। এটা পুলিশ নাকি ডাকাত বোঝা দায়!”

‎আরেক প্রাইভেটকার চালক আক্ষেপ করে বলেন, “সিটি গেইট পার হওয়া মানেই একটা আতঙ্ক। সোর্সদের আচরণ এতটাই উগ্র যে পরিবার নিয়ে রাতে এই পথ দিয়ে চলাফেরা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”


‎মহাসড়কের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সোর্সদের এই বেপরোয়া চাঁদাবাজি স্থানীয় ফাঁড়ি বা থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অজানা নয়। কিন্তু কেন এই নীরবতা? অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি রাতে গাড়ি থামিয়ে যে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়, তার একটি নির্দিষ্ট অংশ বা ‘পার্সেন্টেজ’ প্রতিদিন সকালে প্রশাসনের নির্দিষ্ট কিছু স্তরের টেবিলে পৌঁছে যায়। এই বিশাল অর্থের ভাগাভাগির কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে আর ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ফাইলের নিচে।

‎চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বারকে এই কালো সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। সোর্সদের এই বেআইনি দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি পুলিশের ভাবমূর্তিও সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। প্রশাসনের শীর্ষ মহলের এখনই উচিত এই নীরবতা ভেঙে কঠোর অ্যাকশনে নামা।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শহীদ জিয়ার প্রথম মাজারে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির শ্রদ্ধা

চট্টগ্রামের সিটি গেইটে চলন্ত গাড়ি থামিয়ে পুলিশ-সোর্স সিন্ডিকেটের বেপরোয়া চাঁদাবাজি: ভুক্তভোগীদের কান্না শুনছে না কেউ

আপডেট সময় : ০৪:৩৯:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

‎ গভীর রাত। অন্ধকারের বুক চিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে ছুটে আসছে একের পর এক পণ্যবাহী ট্রাক ও দূরপাল্লার গাড়ি। চট্টগ্রাম নগরীর প্রবেশদ্বার ‘সিটি গেইট’ এলাকায় আসতেই হঠাৎ লাঠি এবং টর্চলাইট হাতে চলন্ত গাড়ির সামনে লাফিয়ে পড়ল ৩-৪ জন যুবক। চালক সজোরে ব্রেক চাপতেই গাড়িটি ঘিরে ফেলা হলো। যুবকদের কারও গায়ে ইউনিফর্ম নেই, নেই কোনো আইনি পরিচয়পত্র। গাড়ি থামানোর কারণ জানতে চাইতেই চালকের কলার চেপে ধরে হুঙ্কার—“গাড়ি সাইড কর! তল্লাশি হবে। ভেতরে ইয়াবা আছে খবর আছে।”

‎চালকের কপালে তখন উদ্বেগের ঘাম। কারণ তিনি জানেন, এটি কোনো আইনি তল্লাশি নয়; এটি নগরীর সবচেয়ে কুখ্যাত ‘পুলিশ-সোর্স সিন্ডিকেটের’ পাতা ফাঁদ। ঠিক একটু দূরেই অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশের কয়েকজন সদস্য। সোর্সদের সবুজ সংকেত পেলেই তারা এগিয়ে আসেন শিকার ধরতে। চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বারে প্রতিদিন এভাবেই চলছে সাধারণ চালক ও যাত্রীদের পকেট কাটার মহোৎসব। অথচ, এই প্রকাশ্য জুলুমের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব।


‎আইন অনুযায়ী, পুলিশের তথ্যদাতা বা ‘সোর্স’দের কোনো গাড়ি থামানোর, তল্লাশি করার বা সাধারণ মানুষকে আটক করার আইনগত অধিকার নেই। কিন্তু সিটি গেইট এলাকায় এই নিয়ম পুরোপুরি উল্টো। এখানে সোর্সরাই সর্বেসর্বা।

‎অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় আকবর শাহ থানা এবং ট্রাফিক বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এক সোর্স সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা মূলত স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও চিহ্নিত অপরাধী। পুলিশের ‘ক্যাশিয়ার’ বা লাইনম্যান হিসেবে এরা কাজ করে। চলন্ত গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির নামে সময় নষ্ট করা, গাড়ির ভেতরে গোপনে মাদক ঢুকিয়ে দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখানো এবং চালকদের মারধর করা এদের নিত্যদিনের কাজ।


‎রাত ১২টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত সিটি গেইট এলাকায় এই সিন্ডিকেটের তাণ্ডব সবচেয়ে বেশি বাড়ে। দূরপাল্লার ট্রাক, সবজি ও ফলবাহী গাড়ি এবং ব্যক্তিগত প্রাইভেটকারকে টার্গেট করা হয়।

‎ গাড়ি থামিয়েই সোর্সরা কেবিনের ভেতর হাতড়ায়। কিছু না পেলেও দাবি করে, “গাড়িতে অবৈধ মাল আছে।” প্রতিবাদ করলে মাদক মামলায় ফাঁসানোর সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়।

সোর্সরা যখন চালককে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে, তখন দৃশ্যপটে আসেন দায়িত্বরত অসাধু পুলিশ সদস্যরা। তারা কাগজপত্র চেক করার নামে জটিলতা তৈরি করেন এবং স্পটেই মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।

পুলিশের হাতে সরাসরি টাকা লেনদেন হয় না। সোর্স বা তাদের নির্ধারিত ‘লাইনম্যানের’ মাধ্যমে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। টাকা দিলেই কেবল গাড়ি ছাড়পত্র পায়, না দিলে গাড়ি ডাম্পিংয়ের ভয় দেখিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়।


‎গত বুধবার রাতে সিটি গেইটে হয়রানির শিকার এক কাঁচামাল ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমার ট্রাকে পচনশীল সবজি ছিল। সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও সোর্সরা গাড়ি থামিয়ে ৩ হাজার টাকা দাবি করে। পুলিশকে বললাম স্যার আমার সব ঠিক আছে, পুলিশ বলল—সোর্সরা বলছে গাড়ি চেক করতে হবে, টাকা দিয়ে ঝামেলা মেটান। সবজি নষ্ট হওয়ার ভয়ে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি। এটা পুলিশ নাকি ডাকাত বোঝা দায়!”

‎আরেক প্রাইভেটকার চালক আক্ষেপ করে বলেন, “সিটি গেইট পার হওয়া মানেই একটা আতঙ্ক। সোর্সদের আচরণ এতটাই উগ্র যে পরিবার নিয়ে রাতে এই পথ দিয়ে চলাফেরা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”


‎মহাসড়কের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সোর্সদের এই বেপরোয়া চাঁদাবাজি স্থানীয় ফাঁড়ি বা থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অজানা নয়। কিন্তু কেন এই নীরবতা? অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি রাতে গাড়ি থামিয়ে যে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়, তার একটি নির্দিষ্ট অংশ বা ‘পার্সেন্টেজ’ প্রতিদিন সকালে প্রশাসনের নির্দিষ্ট কিছু স্তরের টেবিলে পৌঁছে যায়। এই বিশাল অর্থের ভাগাভাগির কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে আর ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ফাইলের নিচে।

‎চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বারকে এই কালো সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। সোর্সদের এই বেআইনি দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি পুলিশের ভাবমূর্তিও সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। প্রশাসনের শীর্ষ মহলের এখনই উচিত এই নীরবতা ভেঙে কঠোর অ্যাকশনে নামা।