রাসেল চৌধুরী
ইতিহাসের কিছু চরিত্র জন্ম নেয় শুধু স্রোতে ভাসার জন্য নয়, বরং স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন এক দিগন্তের রেখা আঁকার জন্য। বাংলাদেশের বহুমাত্রিক রাজনীতির পটভূমিতে ঠিক তেমনি এক অদম্য, অনমনীয় এবং প্রথাবিরোধী নাম—বেগম খালেদা জিয়া। আজ ১৫ আগস্ট, তাঁর ৮২তম জন্মবার্ষিকী। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তাঁর প্রয়াণের পর, এটিই তাঁর প্রথম জন্মবার্ষিকী, যা অগণিত মানুষের হৃদয়ে এক অদ্ভুত শূন্যতা এবং একই সঙ্গে এক গভীর প্রেরণার জন্ম দিয়েছে। এইপ্রমুখ বিশেষ দিনে দৈনিক ‘সংবাদ প্রতিদিন’ কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক স্তাবকতা নয়, বরং তাঁর জীবন-সংগ্রামের সেই দিকগুলোকে উন্মোচন করতে চায়, যা তাঁকে একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে কোটি মানুষের ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে রূপান্তর করেছে।
গৃহকোণ থেকে রাজপথ: এক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর
১৯৬০ সালে সেনাকর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর তাঁর জীবন কেটেছিল এক নিভৃত, সুশৃঙ্খল পারিবারিক আবহে। কিন্তু ১৯৮১ সালের মে মাসে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ডের পর সেই নিভৃত জীবন চিরতরে বদলে যায়। রাজনীতির চড়াই-উতরাই ও দলের ভাঙন যখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন।
এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি ছিল এক চরম মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। এক নিঃসঙ্গ মা, যিনি একদিকে তাঁর দুই সন্তানকে আগলে রাখছেন, অন্যদিকে একটি বিশাল রাজনৈতিক দলের হাল ধরছেন। ১৯৮৪ সালে দলের হাল ধরার পর থেকে তিনি আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাননি। এর পরের ইতিহাস কোনো মসৃণ রাজপথের গল্প নয়, এটি ছিল স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ ৯ বছরের এক একটানা আপসহীন আন্দোলনের মহাকাব্য।
আপসহীনতার দর্শন এবং ‘গণতন্ত্রের মা’
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ‘আপসহীন’ চরিত্র। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি যখন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী ছিলেন না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন নারী জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ তৈরি, এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য স্বনির্ভরতার নানা কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ক্ষমতার মসনদ তাঁর কাছে কোনো ভোগের বস্তু ছিল না। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি যে অপরিসীম নির্যাতন, কারাবরণ এবং শারীরিক অসুস্থতা সহ্য করেছেন, তা তাঁর এই আপসহীন দর্শনেরই এক নিষ্ঠুর বাস্তব রূপ।
শূন্যতা ও বেঁচে থাকার নতুন সংজ্ঞা
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হারিয়েছেন তাঁর স্বামী ও কনিষ্ঠ পুত্রকে। দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন নিঃসঙ্গ কারাবাসে, চরম শারীরিক অসুস্থতায়। কিন্তু প্রতিবারই তাঁর এই একাকীত্ব ও দুঃখকে তিনি রূপান্তর করেছেন দেশের মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসায়। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং ২০২৬-এর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর আদর্শ ও ত্যাগের গুরুত্ব আজ তরুণ প্রজন্মের কাছে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তিনি আজ আমাদের মাঝে সশরীরে নেই, কিন্তু রেখে গেছেন এক অদম্য রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর শ্রদ্ধাঞ্জলি
বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকীতে ‘সংবাদ প্রতিদিন’ পরিবার তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর দেশপ্রেম, দীর্ঘ সংগ্রাম এবং অটল আত্মমর্যাদাবোধ এদেশের প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আসেন, যাঁরা মৃত্যুর পরও তাঁদের আদর্শের মাধ্যমে প্রতিদিন বেঁচে থাকেন। বেগম খালেদা জিয়া ঠিক তেমনি এক অবিনাশী নাম, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল দেদীপ্যমান থাকবে।
অবিনাশী পথিকের নাম খালেদা জিয়া: এক নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের মহাকাব্য
জনপ্রিয় সংবাদ











