ঢাকা ০৫:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আলোর মহাকাব্যে তিলোত্তমা চাটগাঁ: ৫৫তম জশনে জুলুসের রাজকীয় প্রস্তুতিতে মুখরিত বন্দরনগরী

  • আপডেট সময় : ০৩:৪৫:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
  • 36

রাসেল চৌধুরী :

‎ইট-পাথরের চেনা কোলাহল পেরিয়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এখন যেন এক অতিপ্রাকৃতিক আলোকময় স্বপ্নপুরী। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ও ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুসের ৫৫তম ঐতিহাসিক আসর। আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ছায়াতলে আয়োজিত এই উৎসবকে কেন্দ্র করে এবার চাটগাঁর বুকে নেমে এসেছে আলোর এক অভূতপূর্ব মহোৎসব, যা অতীতে আর কখনো দেখেনি নগরবাসী।

‎এবার সাজসজ্জার প্রচলিত বলয় ভেঙে পুরো চট্টগ্রামকে সাজানো হয়েছে সম্পূর্ণ আধুনিক ও ভিন্ন আঙ্গিকে। বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের ওপর থেকে শুরু করে মুরাদপুর, চকবাজার, জিইসি মোড় হয়ে কাজীর দেউড়ি পর্যন্ত মাইলের পর মাইল রাজপথ ঢেকে দেওয়া হয়েছে থিম-ভিত্তিক অত্যাধুনিক থ্রি-ডি এলইডি লাইটিংয়ের চাদরে। সাধারণ বাতির বদলে এই বিশেষ ত্রিমাত্রিক আলোকরশ্মি রাতের অন্ধকারে রাজপথে তৈরি করছে এক মায়াবী আলোর সমুদ্র। সড়কের মাঝখানের আইল্যান্ডগুলোতে নিখুঁত কারুকার্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি এবং পবিত্র মক্কা ও মদিনা শরিফের সুউচ্চ মিনারের আলোকচিত্র। মৃদু বাতাসে দুলছে ‘কালিমা তায়্যিবা’ খচিত হাজার হাজার সবুজ সিল্কের পতাকা ও নকশাদার তোরণদ্বার, যা পুরো শহরকে এনে দিয়েছে এক রাজকীয় অবয়ব।

‎আগামী ২৬ আগস্ট (বুধবার) সকাল ৮টায় ষোলশহর আলমগীর খানকাহ-এ কাদেরিয়া সৈয়দিয়া তৈয়বিয়া থেকে এই মহাসমাবেশ শুরু হবে। এবারের জুলুসের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে নেতৃত্ব দিতে পাকিস্তানস্থ সিরিকোট দরবার শরিফ থেকে ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামে পা রেখেছেন আনজুমান ট্রাস্টের এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট পীরে বাঙাল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মা.জি.আ.)। তাঁর সাথে রয়েছেন সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ এবং সাহেবজাদা সৈয়্যদ আকিব আহমদ শাহ। শোভাযাত্রাটি নগরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে দুপুরে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা সংলগ্ন জুলুস ময়দানে এসে সমাপ্ত হবে, যেখানে আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনা করা হবে।


‎সম্প্রতি আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে উৎসবের বিশাল কর্মযজ্ঞের বিবরণ দেন আনজুমান ট্রাস্টের সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এবার দেশ-বিদেশের প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগম ঘটবে চাটগাঁর মাটিতে। এই বিশাল আধ্যাত্মিক মিলনমেলার পবিত্রতা রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর।”

‎আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জুলুসের নিরাপত্তা ও পকেটমার উচ্ছেদে ট্রাস্টের নিজস্ব ১০ হাজার পোশাকধারী সুপ্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক (আনজুমান সিকিউরিটি ফোর্স) পুরো রুট কর্ডন করে রাখবে। জুলুসের ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতে ট্রাস্ট এবং জাতীয় পতাকা ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যানার বা ফেস্টুন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া কোনো ধরনের ড্রাম সেট বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো যাবে না। লাখ লাখ মানুষের এই যাতায়াতের পর শহরকে নোংরা হতে দেওয়া হবে না। জুলুস শেষ হওয়ার ঠিক ১০ মিনিটের মধ্যে পুরো রুট ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা স্কোয়াড। তীব্র গরমের কথা মাথায় রেখে পুরো রুটজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানির বুথ এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ক্যাম্প।

‎চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) জানিয়েছে, ২৬ আগস্ট ভোর ৬টা থেকে জুলুস শেষ না হওয়া পর্যন্ত মুরাদপুর, বিবিরহাট, বহদ্দারহাট এবং ২ নম্বর গেট অভিমুখী সকল প্রকার ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে এবং গাড়িগুলো বিকল্প সড়ক দিয়ে ডাইভার্ট করা হবে। পুরো রুটটি সিসিটিভি ক্যামেরা ছাড়াও ড্রোনের মাধ্যমে আকাশ থেকে কঠোর নজরদারিতে রাখবে বিশেষ নিরাপত্তা টিম।

‎সব মিলিয়ে, আধ্যাত্মিক টান আর আধুনিকতার এক মহাকাব্যিক মেলবন্ধনে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই ধর্মীয় মহাসমাবেশকে বরণ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এখন রূপসী চট্টগ্রাম।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শহীদ জিয়ার প্রথম মাজারে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির শ্রদ্ধা

আলোর মহাকাব্যে তিলোত্তমা চাটগাঁ: ৫৫তম জশনে জুলুসের রাজকীয় প্রস্তুতিতে মুখরিত বন্দরনগরী

আপডেট সময় : ০৩:৪৫:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

রাসেল চৌধুরী :

‎ইট-পাথরের চেনা কোলাহল পেরিয়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এখন যেন এক অতিপ্রাকৃতিক আলোকময় স্বপ্নপুরী। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ও ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুসের ৫৫তম ঐতিহাসিক আসর। আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ছায়াতলে আয়োজিত এই উৎসবকে কেন্দ্র করে এবার চাটগাঁর বুকে নেমে এসেছে আলোর এক অভূতপূর্ব মহোৎসব, যা অতীতে আর কখনো দেখেনি নগরবাসী।

‎এবার সাজসজ্জার প্রচলিত বলয় ভেঙে পুরো চট্টগ্রামকে সাজানো হয়েছে সম্পূর্ণ আধুনিক ও ভিন্ন আঙ্গিকে। বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের ওপর থেকে শুরু করে মুরাদপুর, চকবাজার, জিইসি মোড় হয়ে কাজীর দেউড়ি পর্যন্ত মাইলের পর মাইল রাজপথ ঢেকে দেওয়া হয়েছে থিম-ভিত্তিক অত্যাধুনিক থ্রি-ডি এলইডি লাইটিংয়ের চাদরে। সাধারণ বাতির বদলে এই বিশেষ ত্রিমাত্রিক আলোকরশ্মি রাতের অন্ধকারে রাজপথে তৈরি করছে এক মায়াবী আলোর সমুদ্র। সড়কের মাঝখানের আইল্যান্ডগুলোতে নিখুঁত কারুকার্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি এবং পবিত্র মক্কা ও মদিনা শরিফের সুউচ্চ মিনারের আলোকচিত্র। মৃদু বাতাসে দুলছে ‘কালিমা তায়্যিবা’ খচিত হাজার হাজার সবুজ সিল্কের পতাকা ও নকশাদার তোরণদ্বার, যা পুরো শহরকে এনে দিয়েছে এক রাজকীয় অবয়ব।

‎আগামী ২৬ আগস্ট (বুধবার) সকাল ৮টায় ষোলশহর আলমগীর খানকাহ-এ কাদেরিয়া সৈয়দিয়া তৈয়বিয়া থেকে এই মহাসমাবেশ শুরু হবে। এবারের জুলুসের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে নেতৃত্ব দিতে পাকিস্তানস্থ সিরিকোট দরবার শরিফ থেকে ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামে পা রেখেছেন আনজুমান ট্রাস্টের এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট পীরে বাঙাল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মা.জি.আ.)। তাঁর সাথে রয়েছেন সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ এবং সাহেবজাদা সৈয়্যদ আকিব আহমদ শাহ। শোভাযাত্রাটি নগরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে দুপুরে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা সংলগ্ন জুলুস ময়দানে এসে সমাপ্ত হবে, যেখানে আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনা করা হবে।


‎সম্প্রতি আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে উৎসবের বিশাল কর্মযজ্ঞের বিবরণ দেন আনজুমান ট্রাস্টের সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এবার দেশ-বিদেশের প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগম ঘটবে চাটগাঁর মাটিতে। এই বিশাল আধ্যাত্মিক মিলনমেলার পবিত্রতা রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর।”

‎আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জুলুসের নিরাপত্তা ও পকেটমার উচ্ছেদে ট্রাস্টের নিজস্ব ১০ হাজার পোশাকধারী সুপ্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক (আনজুমান সিকিউরিটি ফোর্স) পুরো রুট কর্ডন করে রাখবে। জুলুসের ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতে ট্রাস্ট এবং জাতীয় পতাকা ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যানার বা ফেস্টুন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া কোনো ধরনের ড্রাম সেট বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো যাবে না। লাখ লাখ মানুষের এই যাতায়াতের পর শহরকে নোংরা হতে দেওয়া হবে না। জুলুস শেষ হওয়ার ঠিক ১০ মিনিটের মধ্যে পুরো রুট ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা স্কোয়াড। তীব্র গরমের কথা মাথায় রেখে পুরো রুটজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানির বুথ এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ক্যাম্প।

‎চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) জানিয়েছে, ২৬ আগস্ট ভোর ৬টা থেকে জুলুস শেষ না হওয়া পর্যন্ত মুরাদপুর, বিবিরহাট, বহদ্দারহাট এবং ২ নম্বর গেট অভিমুখী সকল প্রকার ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে এবং গাড়িগুলো বিকল্প সড়ক দিয়ে ডাইভার্ট করা হবে। পুরো রুটটি সিসিটিভি ক্যামেরা ছাড়াও ড্রোনের মাধ্যমে আকাশ থেকে কঠোর নজরদারিতে রাখবে বিশেষ নিরাপত্তা টিম।

‎সব মিলিয়ে, আধ্যাত্মিক টান আর আধুনিকতার এক মহাকাব্যিক মেলবন্ধনে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই ধর্মীয় মহাসমাবেশকে বরণ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এখন রূপসী চট্টগ্রাম।