রাসেল চৌধুরী :
রাজনীতিতে ‘উত্তরাধিকার’ শব্দটির সাথে আমাদের পরিচয় বহু পুরোনো। ক্ষমতার হাতবদল কিংবা চেনা রাজপ্রাসাদের চেনা চত্বরে নতুন মুখের আগমনকে এ দেশের মানুষ সবসময় একটু সংশয়ের চোখেই দেখেছে। কিন্তু সেই চেনা বৃত্ত ভেঙে, কোনো রকম পূর্ব-সক্রিয়তার ঢাকঢোল না পিটিয়ে, কেবল কাজের মলাটে নতুন এক রাজনীতির জন্ম দেওয়া যায়—তা করে দেখালেন সাঈদ আল নোমান। বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল নোমানের সুযোগ্য পুত্র তিনি। গত ফেব্রুয়ারি (২০২৬) মাসের নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী-হালিশহর-খুলশী) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর, ঘড়ির কাঁটায় মাত্র ১৮০ দিন বা ছয় মাস পার হয়েছে। এই স্বল্প সময়েই তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি কেবল একজন নেতার পুত্র নন; বরং নিজেই একজন দূরদর্শী, পরিচ্ছন্ন এবং মানবিক জননেতা।
চট্টগ্রামের রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে বহু চড়াই-উতরাই এসেছে। কিন্তু মাত্র ১৮০ দিনে একজন সাংসদ তাঁর নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি স্তরে এমন গভীর ছাপ ফেলতে পারেন, তা বন্দরনগরীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। কোনো রকম সস্তা চমক নয়, বরং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতির অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন এবং খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর এক অনন্য উপাখ্যান তৈরি করেছেন এই উচ্চশিক্ষিত তরুণ রাজনীতিবিদ।
ড্রয়িংরুম থেকে কাদার মাঠে: সংকটে ফ্রন্টলাইন লিডারশিপ
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় অভিশাপের নাম ‘জলাবদ্ধতা’ এবং বর্ষাকালে পাহাড় ধসের নির্মম ট্র্যাজেডি। অতীতে দেখা গেছে, দুর্যোগের সময় নেতারা পাজেরো গাড়ির কাচ নামিয়ে কিংবা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তদারকি করেছেন। কিন্তু সাঈদ আল নোমান সেখানে এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করলেন।
পাহাড় ধসে যখন পাহাড়তলী ও খুলশী এলাকায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটল, তিনি প্রোটোকলের তোয়াক্কা না করে ছুটে গেলেন দুর্ঘটনাস্থলে। নিহত দুই পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা তো দিলেনই, সেই সাথে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বাস করা পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সাথে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নিলেন।
গত মৌসুমের বন্যায় যখন হালিশহর ও ডবলমুরিংয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হলো, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখল চট্টগ্রামবাসী। হাঁটু সমান নোংরা পানিতে নেমে, সাধারণ মানুষের ঘরের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে খাবার ও ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন স্বয়ং এমপি। এটি কোনো সস্তা প্রচারণার অংশ ছিল না; বরং গভীর রাতেও তিনি কন্ট্রোল রুমে বসে পানি নিষ্কাশনের পাম্পগুলোর তদারকি করেছেন। জলাবদ্ধতার স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জন্য তিনি ইতিমধ্যে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল এবং সিডিএ-এর সাথে সমন্বয় করে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছেন, যা চট্টগ্রামের ইতিহাসে প্রথম।
জুলাই বিপ্লবের বীরদের ঋণ শোধ: দায়বদ্ধতার রাজনীতি
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এ দেশ দেখেছিল, তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। সেই আন্দোলনে বুক পেতে দেওয়া শহীদদের প্রতি সাঈদ আল নোমানের শ্রদ্ধাবোধ ও দায়বদ্ধতা রাজনীতিতে এক নতুন স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড তৈরি করেছে।
বিপ্লবের অন্যতম শহীদ ফারুকের পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, বিশেষ করে তাঁর অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার সমস্ত দায়ভার তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, “ফারুক এ দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাঁর পরিবারকে একা ফেলে রাখা মানে বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।” একইভাবে শহীদ ওয়াসিম ও শহীদ ফয়সলের পরিবারের কাছে গিয়ে তিনি যে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন, তা অন্যান্য জনপ্রতিনিধিদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি কেবল অর্থ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি, প্রতি মাসে এই পরিবারগুলোর খোঁজখবর রাখার জন্য একটি স্থায়ী সেল গঠন করে দিয়েছেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আধুনিকতার ছোঁয়া
ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে শিক্ষা ক্ষেত্রের আধুনিকায়ন কীভাবে করতে হয়, তা সাঈদ আল নোমানের চেয়ে ভালো আর কে জানবেন! রাজনীতিতে আসার পর তিনি তাঁর সেই প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন সরকারি ও বেসরকারি প্রান্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে।
তাঁর নির্বাচনী এলাকার স্কুল-কলেজগুলোর অবকাঠামোগত চেহারা পাল্টাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি নিয়ে এসেছেন ‘অল-ইয়ার এডুকেশন সাপোর্ট কনসেপ্ট’ বা সারা বছরের শিক্ষা সহায়তা প্রকল্প। এর আওতায় দরিদ্র কিন্তু মেধাবী নারী শিক্ষার্থীদের পুরো বছরের টিউশন ফি, বইপত্র ও যাতায়াত খরচের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে কেবল অর্থের অভাবে কোনো কন্যাসন্তানের পড়াশোনা বন্ধ না হয়।
স্বাস্থ্য খাতের চিত্রও আরও আশাব্যঞ্জক। হালিশহর
এলাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের জন্য তিনি সরকারি জমি বরাদ্দ ও দাতাগোষ্ঠীদের সাথে আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন। তবে সবচেয়ে মানবিক দৃশ্যটি দেখা যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। যখনই তিনি তাঁর কোনো অসুস্থ দলীয় নেতাকর্মীকে দেখতে হাসপাতালে যান, তাঁর চোখ চলে যায় পাশের বেডে শুয়ে থাকা অজ্ঞাতনামা, অসহায় দরিদ্র রোগীদের দিকে। পকেট থেকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবার খরচ দিয়ে আসা কিংবা হাসপাতালের আইসিইউ বেডের ব্যবস্থা করে দেওয়ার মতো ঘটনা এখন তাঁর ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘটছে।
আকস্মিক বিপর্যয় ও প্রবাসীদের ক্রন্দন: যেখানেই সংকট, সেখানেই নোমানপুত্র
কয়েক মাস আগে হালিশহরে যে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল, তা পুরো চট্টগ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ওই দুর্ঘটনায় নিহত ৭ জনের পরিবারের আকাশ ভেঙে পড়েছিল। সাঈদ আল নোমান সেই মুহূর্তে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। নিহতদের দাফন-কাফন থেকে শুরু করে আহতদের উন্নত চিকিৎসার সমস্ত ব্যয়ভার তিনি নিজে বহন করেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কর্মসংস্থানের জন্য তিনি স্থানীয় কলকারখানাগুলোর সাথে কথা বলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছেন।
তাঁর মানবিকতার হাত কেবল দেশের সীমানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বাহরাইনে নিহত এক রেমিট্যান্স যোদ্ধার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং বিমানবন্দরে আইনি জটিলতা নিরসনে তাঁর তড়িৎ হস্তক্ষেপ ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রবাসীদের রক্ত পানি করা টাকায় দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, আর মৃত্যুর পর তাঁদের লাশ বিমানবন্দরে পড়ে থাকবে—এটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাঁর ব্যক্তিগত লবিং ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যমে অত্যন্ত সসম্মানে সেই মরদেহ তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়।
অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’: অবক্ষয়মুক্ত চট্টগ্রামের স্বপ্ন
চট্টগ্রাম-১০ আসনের বাসিন্দাদের অন্যতম প্রধান ক্ষোভের জায়গা ছিল কিশোর গ্যাং এবং মাদকের অবাধ বিস্তার। সাঈদ আল নোমান দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই ঘোষণা করেছিলেন, “আমার দলে কোনো অপরাধীর জায়গা নেই।”
বিগত ১৮০ দিনে হালিশহর, পাহাড়তলী ও ডবলমুরিং এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তিনি দিয়েছেন পূর্ণ স্বাধীনতা। কোনো রাজনৈতিক সুপারিশ বা ‘তদবির’ তাঁর দরবারে পাত্তা পায় না। মসজিদ, মাদ্রাসা এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরগুলোর পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের মাধ্যমে তিনি এলাকায় একটি ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের আবহ তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যা তরুণ সমাজকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনছে।
এক নতুন ভোরের কান্ডারি: কেন তিনি অনন্য?
সাঈদ আল নোমানের এই ১৮০ দিনের সাফল্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর মূল শক্তি হলো তাঁর মার্জিত রুচি, উচ্চশিক্ষা এবং পরিচ্ছন্ন চিন্তা-চেতনা। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে যখন পেশিশক্তি আর কর্কশ ভাষার দাপট ছিল, সেখানে তিনি সমর্থকদের সাথে তো বটেই, সাধারণ রিকশাচালক বা চা বিক্রেতার সাথেও অত্যন্ত বিনীতভাবে কথা বলেন। তাঁর এই অমায়িক ব্যবহার দল-মত নির্বিশেষে সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
বাবার সব গুণ তো তাঁর রক্তে রয়েছেই, সাথে যুক্ত হয়েছে আধুনিক পৃথিবীর প্রশাসনিক মেধা। তিনি প্রমাণ করেছেন, ইশতেহার কেবল ভোটের আগে দেখানোর রঙিন কাগজ নয়, এটি একটি পবিত্র আমানত। আর তাই মাত্র ছয় মাসেই তিনি চট্টগ্রামের সেরা সাংসদ হিসেবে নিজের নাম খোদাই করে নিয়েছেন।
চট্টগ্রামের মানুষ এখন আর পেছনের দিকে তাকাতে চায় না। সাঈদ আল নোমান যেভাবে প্রতিটি ঘরে মানবিকতার আলো ছড়াচ্ছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই যে—তিনি কেবল চট্টগ্রাম-১০ আসনের এমপি নন, বরং তিনি আগামীর পুরো চট্টগ্রামের রাজনীতির যোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও অবিসংবাদিত কর্ণধার হতে যাচ্ছেন। জনতার কাঠগড়ায় তিনি ইতিমধ্যেই উত্তীর্ণ, এবার কেবল দিগ্বিজয়ের পালা
উত্তরাধিকারের গণ্ডি পেরিয়ে ‘জনতার নেতা’: চট্টগ্রামে সাঈদ আল নোমানের মানবিক ১৮০ দিন
জনপ্রিয় সংবাদ











