ঢাকা ০৫:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাতুনগঞ্জ থেকে পতেঙ্গা সী-বিচ: চাটগাঁর ফুটপাতে ছদ্মবেশী মরণফাঁদ, চায়ের কাপ আর পিঠার থালায় ‘স্লো পয়জন’

  • আপডেট সময় : ০৫:২২:৫৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
  • 26

রাসেল চৌধুরী


‎ঝুম বৃষ্টির পর চট্টগ্রাম নগরীর মোড়ে মোড়ে জমে থাকা জলকাদা। তার মাঝেই রাস্তার পাশে কাঠের বেঞ্চে বসে ধোঁয়া ওঠা চিতই পিঠার ওপরে লাল টকটকে লইট্যা শুঁটকির ভর্তা মাখিয়ে মুখে পুরছেন এক তরুণ। পাশেই মাটির উনুনে কেটলির নলে শিস কেটে ফুটছে ঘন দুধের চা। আপাতদৃষ্টিতে চাটগাঁর এই চেনা আড্ডার দৃশ্যটি দারুণ উপভোগ্য মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক লোমহর্ষক অন্ধকার বাস্তবতা আতিথেয়তা আর ঐতিহ্যের আবরণে চট্টগ্রামের ফুটপাতগুলোতে প্রতিদিন কোটি টাকার যে নাস্তার বাজার বসছে, তার একটি বড় অংশ আসলে মানুষের শরীরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে মারণঘাতী কেমিক্যাল।

‎সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জ, রিয়াজুদ্দিন বাজার, কাজির দেউরী, নিউমার্কেট, জিসির মোড়, দেওয়ান হাট এবং পতেঙ্গা সী-বিচ এলাকায় চালানো বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কীভাবে কিছু অসাধু চক্র আমাদের দৈনন্দিন রসনাভিলাষকে পুঁজি করে এক ভয়ংকর বিষবাণিজ্য ফেঁদে বসেছ।

‎অনুসন্ধানী দল চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি বাজারগুলো থেকে শুরু করে ফুটপাতের চূড়ান্ত ভোক্তার থালা পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনটি খতিয়ে দেখেছে। প্রাপ্ত তথ্যগুলো রীতিমতো পিলে চমকানোর মতো:

খাতুনগঞ্জের কয়েকটি অসাধু সিন্ডিকেট কাপড়ের কারখানায় ব্যবহৃত টেক্সটাইল ডাই এবং ব্লিচিং এজেন্ট (ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাইড্রোস) কম দামে এনে বাজারে ছাড়ছে।

‎ কাজির দেউরী, নিউমার্কেট ও জিসির মোড়ের রাস্তার ধারের জিলাপি কিংবা পাটিসাপটার ব্যাটারে এই কাপড়ের রং মেশানো হচ্ছে যাতে খাবারগুলো দীর্ঘক্ষণ চকচকে আর মচমচে থাকে। চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তার প্রধান আকর্ষণ হলো চিতই পিঠার সাথে ঝাল শুঁটকি ভর্তা। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, রিয়াজুদ্দিন বাজারের কিছু গোপন আড়তে কাঁচা শুঁটকিতে মাছি ও পোকা মাকড় ঠেকাতে নিষিদ্ধ কীটনাশক ডিডিটি পাউডার এবং ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে এই শুঁটকিই প্রতিদিন ভোরে চলে যাচ্ছে ফুটপাতের শত শত পিঠার দোকানে।

‎ দেওয়ান হাট এবং জিসির মোড়ের মতো অত্যন্ত ব্যস্ত ট্রাফিক পয়েন্টগুলোর দোকানগুলোতে যে তেল ব্যবহার করা হয়, তা দিনের পর দিন কড়াইতে পুড়তে পুড়তে আکاتরার মতো কালো হয়ে যায়। নতুন তেলের খরচ বাঁচাতে এই পোড়া
‎তেলের ব্যবহার এখন এক ওপেন সিক্রেট।

পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত বা সী-বিচ। এখানকার শত শত ভাসমান দোকানে যেসব কাঁকড়া ফ্রাই, রূপচাঁদা ফ্রাই বা চিংড়ি বিক্রি হয়, সেগুলোকে দীর্ঘক্ষণ পচনমুক্ত ও শক্ত রাখতে ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ এবং কাপড়ের লাল রং অবাধে মেশানো হচ্ছে।

‎জিসির মোড়ের একটি বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করা মধ্যবয়সী চাকুরিজীবী নাসির উদ্দিন (৪৫)। বিগত দেড় দশক ধরে বিকেলের ক্লান্তি দূর করতে কাজির দেউরী এবং নিউমার্কেটের ফুটপাতের টং দোকান থেকে গরম জিলাপি, ডালপুরি আর কড়া লিকারের চা খাওয়া ছিল তার অভ্যাসের অংশ। গত বছর আকস্মিকভাবে জন্ডিস ও তীব্র লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত হন তিনি।

‎অশ্রুসিক্ত চোখে নাসির উদ্দিন বলেন, “আমি ভাবতাম গরম গরম ভাজাপোড়া খাচ্ছি, এতে আর কী ক্ষতি হবে? কিন্তু ডাক্তাররা যখন আমার লিভার ও কিডনি পরীক্ষা করলেন, তখন আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। তারা পরিষ্কার বললেন, আমি নাকি বছরের পর বছর ধরে কেমিক্যাল আর বিষাক্ত বিষাক্ত ডাই খেয়ে নিজের শরীর নিজেই শেষ করেছি। আজকে আমি পঙ্গু, আমার পরিবার সর্বস্বান্ত। কয়েকটা টাকার জন্য যারা খাবারে এই বিষ মেলায়, তারা আসলে ছদ্মবেশী খুনি।”


‎রাস্তার ধারের খাবারে এই বিষাক্ত উপাদানের প্রভাব সম্পর্কে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের একজন সিনিয়র বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক বলেন:

‎”খাতুনগঞ্জ বা রিয়াজুদ্দিন বাজার থেকে সরবরাহ করা এই রাসায়নিকগুলো সরাসরি স্লো-পয়জনিং। কাপড়ের রং আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোডা মানবদেহের পরিপাকতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। আমাদের কাছে লিভার সিরোসিস এবং অল্প বয়সে কিডনি বিকল হওয়ার যত রোগী আসছেন, তাদের হিস্ট্রি নিলে দেখা যায় সিংহভাগই বাইরের খোলা খাবারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

‎তিনি আরও যোগ করেন, “পতেঙ্গা সী-বিচের বা দেওয়ান হাটের ফুটপাতে ব্যবহৃত ডিডিটি পাউডার মিশ্রিত শুঁটকি এবং দিনের পর দিন পোড়ানো কালো তেল কার্সিনোজেনিক উপাদান তৈরি করে । এটি মানুষের পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়, যা কোনো মানুষের পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।


‎খাবারের এই ভয়ংকর কাণ্ড নিয়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন:

‎”আমরা নিয়মিত কাজির দেউরী, নিউমার্কেট, জিসির মোড়, দেওয়ান হাট এবং পতেঙ্গা সী-বিচ এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালাচ্ছি। অনেক নামী পাইকারি আড়ত এবং নামহীন ফুটপাতের দোকানকে আমরা হাতেনাতে বিষাক্ত উপাদান ব্যবহারের দায়ে সিলগালা ও বিপুল পরিমাণ জরিমানা করেছি। তবে কেবল জরিমানা করে এই মানসিকতা বদলানো কঠিন। আমরা এখন সরাসরি পাইকারি উৎসগুলোতে চিরুনি অভিযান শুরু করেছি, যেখান থেকে এই কেমিক্যালগুলো ছড়াচ্ছে। খাদ্যে বিষ প্রয়োগকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”


‎মানুষের তৈরি খাবারের প্রতি সাধারণ মানুষের একটা অন্যরকম আবেগ ও ভরসা থাকে। মানুষ ফুটপাতের চা-পিঠার দোকানে মানুষের হাতের ছোঁয়া খোঁজে। কিন্তু সেই মানুষেরাই যখন অতি-মুনাফার লোভে নিজের ভাইকে সরাসরি বিষ খাওয়ায়, তখন তা শুধু খাদ্যের ভেজাল থাকে না, নৈতিকতার চরম অবক্ষয় হয়ে দাঁড়ায়।


‎এই ভয়ংকর খাদ্য-সন্ত্রাস থেকে নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচাতে ভোক্তাদের সচেতনতার পাশাপাশি দেশের প্রচলিত কঠোর আইনের প্রয়োগ জানা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

‎ জিলাপি, জেলি, মিষ্টি নাস্তা কিংবা সী-বিচের কাঁকড়া ফ্রাই যদি অতিরিক্ত উজ্জ্বল হলুদ বা লাল দেখায়, তবে বুঝবেন তাতে টেক্সটাইল ডাই বা কাপড়ের ক্ষতিকর রং থাকার সম্ভাবনা শতভাগ] প্রাকৃতিক রঙের খাবার বেছে নিন।

দেওয়ান হাট বা জিসির মোড়ের যেসব দোকানে কড়াইয়ের তেল কুচকুচে কালো বা চটচটে ঘন হয়ে গেছে, সেখান থেকে সিঙ্গাড়া, সমোসা বা ডালপুরি কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন।

চিতই পিঠার সাথে ভর্তা খাওয়ার সময় শুঁটক তীব্র বা অতিরিক্ত ঝাঁঝালো রাসায়নিকের গন্ধ পেলে তা بর্জন করুন। খাঁটি শুঁটকিতে স্বাভাবিক আঁশটে গন্ধ থাকবে, কোনো পাউডারের আস্তরণ থাকবে

অতিরিক্ত দ্রুত ঘন করা চায়ে কেমিক্যালের মিশ্রণ থাকতে পারে রাস্তার ধারের চা পানের ক্ষেত্রে মাটির কাপ বা ওয়ান-টাইম কাগজের কাপ ব্যবহার করা তুলনামূলক নিরাপদ।

‎বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী খাবারে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো একটি গুরুতর ও জামিনঅযোগ্য অপরাধ:

নিরাপদ খাদ্য আইনের আওতায় খাবারে নিষিদ্ধ বিষাক্ত রাসায়নিক (যেমন: ডিডিটি, টেক্সটাইল রং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাইড্রোস) ব্যবহার করলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা (কিংবা উভয় দণ্ড) হতে পারে।

একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে শাস্তির মেয়াদ দ্বিগুণ হয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

ক্ষুধা মেটানোর জন্য যে খাবার মানুষ খাচ্ছে, তা যদি নিজেই বিষ হয়ে দাঁড়ায়, তবে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারের সুনাম ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গুত্বের হাত থেকে বাঁচাতে এই খাদ্যের বিষাক্ত সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলার এখনই সময়।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শহীদ জিয়ার প্রথম মাজারে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির শ্রদ্ধা

খাতুনগঞ্জ থেকে পতেঙ্গা সী-বিচ: চাটগাঁর ফুটপাতে ছদ্মবেশী মরণফাঁদ, চায়ের কাপ আর পিঠার থালায় ‘স্লো পয়জন’

আপডেট সময় : ০৫:২২:৫৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

রাসেল চৌধুরী


‎ঝুম বৃষ্টির পর চট্টগ্রাম নগরীর মোড়ে মোড়ে জমে থাকা জলকাদা। তার মাঝেই রাস্তার পাশে কাঠের বেঞ্চে বসে ধোঁয়া ওঠা চিতই পিঠার ওপরে লাল টকটকে লইট্যা শুঁটকির ভর্তা মাখিয়ে মুখে পুরছেন এক তরুণ। পাশেই মাটির উনুনে কেটলির নলে শিস কেটে ফুটছে ঘন দুধের চা। আপাতদৃষ্টিতে চাটগাঁর এই চেনা আড্ডার দৃশ্যটি দারুণ উপভোগ্য মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক লোমহর্ষক অন্ধকার বাস্তবতা আতিথেয়তা আর ঐতিহ্যের আবরণে চট্টগ্রামের ফুটপাতগুলোতে প্রতিদিন কোটি টাকার যে নাস্তার বাজার বসছে, তার একটি বড় অংশ আসলে মানুষের শরীরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে মারণঘাতী কেমিক্যাল।

‎সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জ, রিয়াজুদ্দিন বাজার, কাজির দেউরী, নিউমার্কেট, জিসির মোড়, দেওয়ান হাট এবং পতেঙ্গা সী-বিচ এলাকায় চালানো বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কীভাবে কিছু অসাধু চক্র আমাদের দৈনন্দিন রসনাভিলাষকে পুঁজি করে এক ভয়ংকর বিষবাণিজ্য ফেঁদে বসেছ।

‎অনুসন্ধানী দল চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি বাজারগুলো থেকে শুরু করে ফুটপাতের চূড়ান্ত ভোক্তার থালা পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনটি খতিয়ে দেখেছে। প্রাপ্ত তথ্যগুলো রীতিমতো পিলে চমকানোর মতো:

খাতুনগঞ্জের কয়েকটি অসাধু সিন্ডিকেট কাপড়ের কারখানায় ব্যবহৃত টেক্সটাইল ডাই এবং ব্লিচিং এজেন্ট (ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাইড্রোস) কম দামে এনে বাজারে ছাড়ছে।

‎ কাজির দেউরী, নিউমার্কেট ও জিসির মোড়ের রাস্তার ধারের জিলাপি কিংবা পাটিসাপটার ব্যাটারে এই কাপড়ের রং মেশানো হচ্ছে যাতে খাবারগুলো দীর্ঘক্ষণ চকচকে আর মচমচে থাকে। চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তার প্রধান আকর্ষণ হলো চিতই পিঠার সাথে ঝাল শুঁটকি ভর্তা। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, রিয়াজুদ্দিন বাজারের কিছু গোপন আড়তে কাঁচা শুঁটকিতে মাছি ও পোকা মাকড় ঠেকাতে নিষিদ্ধ কীটনাশক ডিডিটি পাউডার এবং ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে এই শুঁটকিই প্রতিদিন ভোরে চলে যাচ্ছে ফুটপাতের শত শত পিঠার দোকানে।

‎ দেওয়ান হাট এবং জিসির মোড়ের মতো অত্যন্ত ব্যস্ত ট্রাফিক পয়েন্টগুলোর দোকানগুলোতে যে তেল ব্যবহার করা হয়, তা দিনের পর দিন কড়াইতে পুড়তে পুড়তে আکاتরার মতো কালো হয়ে যায়। নতুন তেলের খরচ বাঁচাতে এই পোড়া
‎তেলের ব্যবহার এখন এক ওপেন সিক্রেট।

পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত বা সী-বিচ। এখানকার শত শত ভাসমান দোকানে যেসব কাঁকড়া ফ্রাই, রূপচাঁদা ফ্রাই বা চিংড়ি বিক্রি হয়, সেগুলোকে দীর্ঘক্ষণ পচনমুক্ত ও শক্ত রাখতে ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ এবং কাপড়ের লাল রং অবাধে মেশানো হচ্ছে।

‎জিসির মোড়ের একটি বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করা মধ্যবয়সী চাকুরিজীবী নাসির উদ্দিন (৪৫)। বিগত দেড় দশক ধরে বিকেলের ক্লান্তি দূর করতে কাজির দেউরী এবং নিউমার্কেটের ফুটপাতের টং দোকান থেকে গরম জিলাপি, ডালপুরি আর কড়া লিকারের চা খাওয়া ছিল তার অভ্যাসের অংশ। গত বছর আকস্মিকভাবে জন্ডিস ও তীব্র লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত হন তিনি।

‎অশ্রুসিক্ত চোখে নাসির উদ্দিন বলেন, “আমি ভাবতাম গরম গরম ভাজাপোড়া খাচ্ছি, এতে আর কী ক্ষতি হবে? কিন্তু ডাক্তাররা যখন আমার লিভার ও কিডনি পরীক্ষা করলেন, তখন আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। তারা পরিষ্কার বললেন, আমি নাকি বছরের পর বছর ধরে কেমিক্যাল আর বিষাক্ত বিষাক্ত ডাই খেয়ে নিজের শরীর নিজেই শেষ করেছি। আজকে আমি পঙ্গু, আমার পরিবার সর্বস্বান্ত। কয়েকটা টাকার জন্য যারা খাবারে এই বিষ মেলায়, তারা আসলে ছদ্মবেশী খুনি।”


‎রাস্তার ধারের খাবারে এই বিষাক্ত উপাদানের প্রভাব সম্পর্কে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের একজন সিনিয়র বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক বলেন:

‎”খাতুনগঞ্জ বা রিয়াজুদ্দিন বাজার থেকে সরবরাহ করা এই রাসায়নিকগুলো সরাসরি স্লো-পয়জনিং। কাপড়ের রং আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোডা মানবদেহের পরিপাকতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। আমাদের কাছে লিভার সিরোসিস এবং অল্প বয়সে কিডনি বিকল হওয়ার যত রোগী আসছেন, তাদের হিস্ট্রি নিলে দেখা যায় সিংহভাগই বাইরের খোলা খাবারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

‎তিনি আরও যোগ করেন, “পতেঙ্গা সী-বিচের বা দেওয়ান হাটের ফুটপাতে ব্যবহৃত ডিডিটি পাউডার মিশ্রিত শুঁটকি এবং দিনের পর দিন পোড়ানো কালো তেল কার্সিনোজেনিক উপাদান তৈরি করে । এটি মানুষের পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়, যা কোনো মানুষের পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।


‎খাবারের এই ভয়ংকর কাণ্ড নিয়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন:

‎”আমরা নিয়মিত কাজির দেউরী, নিউমার্কেট, জিসির মোড়, দেওয়ান হাট এবং পতেঙ্গা সী-বিচ এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালাচ্ছি। অনেক নামী পাইকারি আড়ত এবং নামহীন ফুটপাতের দোকানকে আমরা হাতেনাতে বিষাক্ত উপাদান ব্যবহারের দায়ে সিলগালা ও বিপুল পরিমাণ জরিমানা করেছি। তবে কেবল জরিমানা করে এই মানসিকতা বদলানো কঠিন। আমরা এখন সরাসরি পাইকারি উৎসগুলোতে চিরুনি অভিযান শুরু করেছি, যেখান থেকে এই কেমিক্যালগুলো ছড়াচ্ছে। খাদ্যে বিষ প্রয়োগকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”


‎মানুষের তৈরি খাবারের প্রতি সাধারণ মানুষের একটা অন্যরকম আবেগ ও ভরসা থাকে। মানুষ ফুটপাতের চা-পিঠার দোকানে মানুষের হাতের ছোঁয়া খোঁজে। কিন্তু সেই মানুষেরাই যখন অতি-মুনাফার লোভে নিজের ভাইকে সরাসরি বিষ খাওয়ায়, তখন তা শুধু খাদ্যের ভেজাল থাকে না, নৈতিকতার চরম অবক্ষয় হয়ে দাঁড়ায়।


‎এই ভয়ংকর খাদ্য-সন্ত্রাস থেকে নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচাতে ভোক্তাদের সচেতনতার পাশাপাশি দেশের প্রচলিত কঠোর আইনের প্রয়োগ জানা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

‎ জিলাপি, জেলি, মিষ্টি নাস্তা কিংবা সী-বিচের কাঁকড়া ফ্রাই যদি অতিরিক্ত উজ্জ্বল হলুদ বা লাল দেখায়, তবে বুঝবেন তাতে টেক্সটাইল ডাই বা কাপড়ের ক্ষতিকর রং থাকার সম্ভাবনা শতভাগ] প্রাকৃতিক রঙের খাবার বেছে নিন।

দেওয়ান হাট বা জিসির মোড়ের যেসব দোকানে কড়াইয়ের তেল কুচকুচে কালো বা চটচটে ঘন হয়ে গেছে, সেখান থেকে সিঙ্গাড়া, সমোসা বা ডালপুরি কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন।

চিতই পিঠার সাথে ভর্তা খাওয়ার সময় শুঁটক তীব্র বা অতিরিক্ত ঝাঁঝালো রাসায়নিকের গন্ধ পেলে তা بর্জন করুন। খাঁটি শুঁটকিতে স্বাভাবিক আঁশটে গন্ধ থাকবে, কোনো পাউডারের আস্তরণ থাকবে

অতিরিক্ত দ্রুত ঘন করা চায়ে কেমিক্যালের মিশ্রণ থাকতে পারে রাস্তার ধারের চা পানের ক্ষেত্রে মাটির কাপ বা ওয়ান-টাইম কাগজের কাপ ব্যবহার করা তুলনামূলক নিরাপদ।

‎বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী খাবারে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো একটি গুরুতর ও জামিনঅযোগ্য অপরাধ:

নিরাপদ খাদ্য আইনের আওতায় খাবারে নিষিদ্ধ বিষাক্ত রাসায়নিক (যেমন: ডিডিটি, টেক্সটাইল রং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাইড্রোস) ব্যবহার করলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা (কিংবা উভয় দণ্ড) হতে পারে।

একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে শাস্তির মেয়াদ দ্বিগুণ হয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

ক্ষুধা মেটানোর জন্য যে খাবার মানুষ খাচ্ছে, তা যদি নিজেই বিষ হয়ে দাঁড়ায়, তবে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারের সুনাম ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গুত্বের হাত থেকে বাঁচাতে এই খাদ্যের বিষাক্ত সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলার এখনই সময়।