বিশেষ নিবন্ধ:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৫ আগস্ট একটি গভীর, সংবেদনশীল এবং জটিল মোড়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হন, যা দেশের রাজনীতির গতিপথ আমূল বদলে দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে একতরফা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা একক বয়ানের বাইরে, একটি বহুমাত্রিক এবং গণতান্ত্রিক জন-আকাঙ্ক্ষার আলোকে এই ইতিহাসকে দেখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে, বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান এবং তাঁর শাসনামলের স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন জাতীয় ইতিহাসের স্বার্থেই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের একক প্রচেষ্টার ফসল নয়, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের গণআন্দোলন এবং সর্বস্তরের মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস। তবে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত, শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জনগণকে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে জাগ্রত ও ঐক্যবদ্ধ করতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বাধিকারের পক্ষে একটি বৈধ ম্যান্ডেট।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ ছিল একটি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য, যা জনগণকে পাকিস্তানি জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তির অন্যতম মূল নীতি হলো—স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল একটি সামষ্টিক অর্জন, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অনুঘটক এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
স্বাধীনতার পর দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে ১৯৭২ সালে গঠন করা হয়েছিল একটি বিশেষ আধা-সামরিক বাহিনী—’জাতীয় রক্ষীবাহিনী’। কিন্তু বাস্তবে এই বাহিনী রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন এবং বিরোধী শক্তির ওপর নির্মম অত্যাচার চালানোর প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়:
রক্ষীবাহিনীকে দেওয়া হয়েছিল বিনা ওয়ারেন্টে যেকোনো নাগরিককে গ্রেপ্তার এবং তল্লাশির অসীম ক্ষমতা। এই ক্ষমতার অপব্যবহার করে তৎকালীন সরকারের বিরোধী শক্তি, বিশেষ করে জাসদ ও অন্যান্য বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়।
এই বাহিনীর হাতে হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, যা স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ‘গুম ও খুনের সংস্কৃতি’র সূচনা করে। মেজবাহউদ্দিন আহমেদ বা সিরাজ সিকদারের মতো প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের রহস্যজনক মৃত্যু ও হত্যাকাণ্ড তৎকালীন সরকারের ফ্যাসিবাদী মানসিকতার প্রমাণ দেয়।
রক্ষীবাহিনীর যেকোনো কর্মকাণ্ডকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার দেশের আদালতের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এই আইনি দায়মুক্তির কারণে বাহিনীটি আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে, যা দেশের বিচারব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
১৯৭৫ সালের শুরুতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রকে রাতারাতি সমূল উৎপাটন করা হয়। ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) নামে একটি মাত্র জাতীয় দল গঠন করে অন্য সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের উদীয়মান গণতন্ত্রের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত:
বাকশাল ব্যবস্থার অধীনে দেশের সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং মুক্ত চিন্তাকে একক দলের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য বাকশালের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়, যা রাষ্ট্রের পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে চরমভাবে দলীয়করণ করে।
বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর মাত্র চারটি রাষ্ট্রীয় অনুগত পত্রিকা বাদে দেশের সমস্ত স্বাধীন ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে জনগণের বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং দেশ এক অন্ধকার সেন্সরশিপের যুগে প্রবেশ করে।
একদিকে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার ও বাকশালের রাজনৈতিক দমনপীড়ন, অন্যদিকে দলীয় নেতা-কর্মীদের লাগামহীন দুর্নীতি, চোরাচালান ও মজুতদারির কারণে ১৯৭৪ সালে দেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লাখ লাখ মানুষের অনাহারে মৃত্যু তৎকালীন সরকারের নৈতিক ভিত্তি ও জনপ্রিয়তা সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থান এবং হত্যাকাণ্ড ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও চরম রক্তক্ষয়ী ঘটনা। তবে এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক বিষয় ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন সরকারের চরম একদলীয় শাসন, রাজনৈতিক অবদমন, অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব, রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার এবং সেনাবাহিনীর ভেতরের পুঞ্জীভূত অসন্তোষের এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।
পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমানের সরকার কর্তৃক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বহাল রাখা নিয়ে যে রাজনৈতিক সমালোচনা করা হয়, তারও একটি ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। খন্দকার মোশতাক আহমদ কর্তৃক জারি করা এই অধ্যাদেশটি তৎকালীন ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড রক্ষা, নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়ানো এবং দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একটি সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল বা আপস ছিল, যা তৎকালীন বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে করা হয়েছিল।
পরবর্তী পাঁচ দশকে, বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি একক, সমালোচনাতীত এবং প্রায় দেবতুল্য আসনে বসানোর চেষ্টা করা হয়। ইতিহাসকে সম্পূর্ণ একমুখী করে, তাঁর শাসনামলের সমস্ত ব্যর্থতা, বাকশালের স্বৈরাচার এবং রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারকে ধামাচাপা দেওয়ার এক রাষ্ট্রীয় প্রজেক্ট চালু ছিল। এর ফলে জিয়াউর রহমানসহ স্বাধীনতার অন্যান্য বীর ও সাধারণ মানুষের অবদানকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, এই একতরফা ইতিহাসের দেয়াল ভেঙে পড়েছে। সমসাময়িক সমাজে এখন একটি বহুত্ববাদী আলোচনা তৈরি হয়েছে। ১৫ আগস্টের রাষ্ট্রীয় ছুটি বাতিল এবং বাধ্যতামূলক বন্দনা থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো মুক্ত হওয়ায়, আজ সাধারণ নাগরিক ও গবেষকেরা স্বাধীনভাবে ইতিহাস মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছেন।
ইতিহাসের কোনো নায়কই সব ভুলের ঊর্ধ্বে নন। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনে যেমন স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান ত্যাগ ও নেতৃত্ব রয়েছে, তেমনই স্বাধীনতার পর বহুদলীয় গণতন্ত্র ধ্বংস করে একদলীয় বাকশাল কায়েম এবং রক্ষীবাহিনীর ত্রাসের এক দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক ছায়াও রয়েছে। বাংলাদেশের একটি পরিপক্ব ও গণতান্ত্রিক জাতি হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার স্বার্থে এই দুই সত্যকেই সমানভাবে স্বীকার করতে হবে। ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড যেমন সমর্থনযোগ্য নয়, তেমনই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ভুল ও স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্তগুলোকে আড়াল করে তাঁকে ইতিহাসের একমাত্র ধ্রুবতারা বানানোর রাজনৈতিক অপচেষ্টাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাফল্য ও ব্যর্থতার এই বাস্তব দাঁড়িপাল্লায় মেপে ইতিহাসকে রাজনীতির বন্দিদশা থেকে মুক্ত করাই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় জাতীয় দায়িত্ব।











