নওগাঁর পোরশা উপজেলার ঘাটনগর ইউনিয়নের কাছারী পাড়ায় মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটছে অসহায় বৃদ্ধ নিগল বাবুর। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, চোখে ঝাপসা দেখা আর চলার সঙ্গী একটি লাঠি—এ নিয়েই প্রতিদিন তাঁর পথচলা। তবে তাঁর এই পথচলার পেছনে রয়েছে একটি ছোট্ট আশা, বয়স্ক ভাতার টাকা পাওয়ার প্রত্যাশা।
প্রতিদিন লাঠিতে ভর দিয়ে ধীর পায়ে বাজারের বিকাশের দোকানগুলোতে যান তিনি। দোকানে গিয়ে কাঁপা কণ্ঠে জানতে চান, “দেখেন তো বাবু, হামার মোবাইলে টাকা ঢুকছে নাকি?” দোকানদার মোবাইল ফোনে খোঁজ নিয়ে টাকা না আসার কথা জানালে মুহূর্তেই মলিন হয়ে যায় তাঁর মুখ। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার ফিরে যান বাড়িতে। পরদিন নতুন আশায় আবারও ছুটে যান একই দোকানে।
বৃদ্ধ নিগল বাবুর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে তাঁর নামে বয়স্ক ভাতা চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি ভাতার টাকা পাননি বলে দাবি করছেন। তাঁর নামে সরকারি ভাতার বরাদ্দ ও নিবন্ধন কার্যকর রয়েছে কি না, কিংবা কোনো কারণে অর্থ বিতরণে জটিলতা তৈরি হয়েছে কি না—তা তাঁর জানা নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
আশপাশের অন্য বয়স্ক ব্যক্তিরা যখন ভাতার টাকা পান, তখন নিগল বাবুর মনেও নতুন করে আশার সঞ্চার হয়। তিনি ভাবেন, এবার হয়তো তাঁর মোবাইলেও টাকা এসেছে। সেই আশায় আবারও বাজারে ছুটে যান। কিন্তু প্রতিবারই অপেক্ষা আর হতাশা নিয়ে ফিরতে হয় তাঁকে। এভাবেই দিন যায়, মাস পেরিয়ে বছর আসে; অথচ তাঁর প্রত্যাশিত ভাতার টাকা পাওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
ছেলের কাছে সাহায্য চেয়েও মেলে না নিয়মিত সাড়া
নিগল বাবুর এক ছেলে রয়েছেন। তিনি মোহনপুরে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস করেন বলে জানা গেছে। ছেলের কাছ থেকে নিয়মিত সহযোগিতা না পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন এই বৃদ্ধ। অভাব-অনটনের মধ্যে থেকেও তিনি ছেলের মোবাইল নম্বরটি মনে রেখেছেন। মাঝেমধ্যে বাজারে কিংবা ঘাটের ধারে পরিচিত-অপরিচিত মানুষের কাছে গিয়ে আকুতি জানিয়ে বলেন, “হামার ছাওয়ালটার কাছে এনা ফোন দাও তো বাপু।”
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ছেলে কখনো ফোন ধরেন, আবার কখনো ধরেন না। ফোনে কথা হলেও আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানান ছেলে। কখনো কখনো ওষুধ কেনার জন্য ১০০ কিংবা ২০০ টাকা পাঠান। তবে এই সামান্য সহযোগিতা দিয়ে বৃদ্ধের নিয়মিত ওষুধ ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
মেয়ের বাড়িতে আশ্রয়, সেখানেও অভাবের সংসার
বর্তমানে নিগল বাবু তাঁর মেয়ে ও জামাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সংসারেও রয়েছে অভাব-অনটন। দিন এনে দিন খাওয়া এই পরিবারে সংসারের খরচ জোগাড় করাই কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে বৃদ্ধের খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো তাঁদের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বয়সের ভারে কাজ করার সামর্থ্য কমে এসেছে। চোখেও আগের মতো দেখতে পান না। অন্যের সহযোগিতা ছাড়া চলাফেরা করাও তাঁর জন্য কষ্টকর। এমন অবস্থায় সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রাপ্য কোনো সহায়তা থাকলে তা তাঁর জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
বয়স্ক ভাতা অসচ্ছল ও বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের সামাজিক সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। যাঁরা বার্ধক্যের কারণে উপার্জনে অক্ষম এবং আর্থিক সংকটে দিন কাটান, তাঁদের জন্য এই সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই নিগল বাবুর ভাতার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতি অনুরোধ—নিগল বাবুর বয়স্ক ভাতার আবেদন, নিবন্ধন ও অর্থ বিতরণের তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তিনি ভাতার জন্য যোগ্য হলে কেন টাকা পাচ্ছেন না, কোনো তথ্যগত ভুল বা প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আর যদি তাঁর নামে ভাতা চালু থাকার তথ্য সঠিক না হয়, তাহলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাঁর যোগ্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হোক।
একই সঙ্গে তাঁর চিকিৎসা, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টিও মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
নিগল বাবুর কাছে হয়তো বয়স্ক ভাতার টাকাটা খুব বেশি কিছু নয়। কিন্তু অভাবের সংসারে সেই অর্থই হতে পারে ওষুধ কেনার অবলম্বন, খাবারের নিশ্চয়তা কিংবা অন্যের কাছে বারবার হাত পাতার কষ্ট কিছুটা কমানোর উপায়।
আজও তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে বাজারের পথে হাঁটেন। প্রতিটি বিকাশের দোকানে গিয়ে একই প্রশ্ন করেন—“দেখেন তো বাবু, হামার মোবাইলে টাকা ঢুকছে নাকি?”
এই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে আছে একজন অসহায় বৃদ্ধের দীর্ঘ অপেক্ষা, বেঁচে থাকার সামান্য প্রত্যাশা আর নিজের প্রাপ্য অধিকারটুকু পাওয়ার আকুতি।
মানবিক বিবেচনায় নিগল বাবুর পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগে তাঁর ভাতার বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং জীবনের শেষ বয়সে অন্তত ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতন মহলের।
নিগল বাবুর পরিচয়:
নাম: নিগল
পিতা: গ্রী সরদার
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম—ডাহুকী, ডাকঘর—আমদা
বর্তমান ঠিকানা: ঘাটনগর কাছারী পাড়া, মেয়ের বাড়ি।
দেখেন তো বাবু, হামার মোবাইলে টাকা ঢুকছে নাকি বয়স্ক ভাতার আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষায় নিগল বাবু
-
মোঃ আরিফুল হক সাহিন পোরশা (নওগাঁ) প্রতিনিধি - আপডেট সময় : ০১:০১:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
- 12
জনপ্রিয় সংবাদ




















