ঢাকা ০৫:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পোশাকে পুলিশ, নেপথ্যে মাদকের কারবারি

  • আপডেট সময় : ০৫:০৫:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
  • 10

উত্তররায় ৫৩১০ ইয়াবাসহ পল্লবী থানার এএসআই গ্রেপ্তার

বিশেষ প্রতিনিধি :

রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন অপরাধের ডালপালা কত দ্রুত ছড়াতে পারে, তার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ মিলল খোদ রাজধানীতে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পল্লবী থানার এক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) এখন নিজেই শ্রীঘরে, তাও আবার ৫ হাজার ৩১০ পিস ইয়াবার এক বিশাল চালানসহ। গ্রেপ্তারকৃত ওই পুলিশ কর্মকর্তার নাম মো. শফিকুল ইসলাম (৪৩) । তার সাথে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এই মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী ওয়াসিম (২৪) নামের এক তরুণকেও।

‎গত রবিবার (২৩ আগস্ট) গভীর রাতে উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় এক নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর যৌথ অভিযান চালিয়ে দক্ষিণখান থানা পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে । তবে তদন্তের স্বার্থে পুরো বিষয়টি গোপন রাখার পর আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি নিশ্চিত করেছেন দক্ষিণখান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বখতিয়ার হোসেন।


‎তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েকদিন ধরে উত্তরার দক্ষিণখান ও আজমপুর এলাকায় একটি বড় ধরনের মাদকের চালান বেচাকেনা হওয়ার সুনির্দিষ্ট গোপন তথ্য ছিল পুলিশের কাছে। সেই তথ্যের সূত্র ধরে রবিবার রাতে আজমপুর কাঁচাবাজার এলাকায় সাদা পোশাকে ওত পেতে থাকে দক্ষিণখান থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল।

‎রাত গভীর হতেই পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ওয়াসিম নামের এক যুবক আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে । পুলিশ সদস্যরা ধাওয়া দিয়ে তাকে কোণঠাসা করে ফেলে এবং তল্লাশি চালিয়ে তার পকেট থেকে প্রথম ৫০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ।

‎আটকের পর পুলিশের পেশাদার জেরার মুখে ভেঙে পড়ে ওয়াসিম। সে স্বীকার করে, তারা মূলত একটি বড় সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করছে, যার প্রধান চালিকাশক্তি খোদ একজন পুলিশ কর্মকর্তা। ওয়াসিমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কালবিলম্ব না করে উত্তরার একটি নির্দিষ্ট ভাড়া বাসায় ঝটিকা অভিযান চালায় পুলিশ । সেখান থেকেই হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় এএসআই শফিকুল ইসলামকে এবং তার দেহ তল্লাশি করে উদ্ধার হয় আরও ২০০ পিস ইয়াবা ।

‎কিন্তু নাটকের এখানেই শেষ ছিল না। ধৃত দুজনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার পর মধ্যরাতে আজমপুর কাঁচাবাজারের বিসমিল্লাহ পল্লীর ‘নূর বিল্ডিং’-এর ৬৭ নম্বর ফ্ল্যাটে চূড়ান্ত অভিযান চালানো হয় । সেই ফ্ল্যাটের ভেতর বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা অবস্থা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও ৫ হাজার ১১০ পিস ইয়াবা । তিন দফার এই সাঁড়াশি অভিযানে সর্বমোট ৫,৩১০ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়, যার বাজারমূল্য লাখ লাখ টাকা ।



‎একজন দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা কোনো প্রকার ভয়ডর ছাড়াই এভাবে সরাসরি মাদক চালানের সাথে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় খোদ পুলিশ বিভাগের ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় শুরু হয়েছে।

‎গ্রেপ্তারকৃত এএসআই শফিকুলের ট্র্যাক রেকর্ড নিয়ে জানতে চাওয়া হলে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “শফিকুল ইসলাম গত জুনের ৮ তারিখে এই থানায় বদলি হয়ে এসেছিলেন। কিন্তু যোগদানের পর থেকেই তিনি দায়িত্ব পালনে চরম গাফিলতি ও অনীহা দেখাতেন। মাত্র দুই-তিন দিন ডিউটি করার পর অসুস্থতার সস্তা অজুহাত দেখিয়ে গত ২১ জুন থেকে তিনি থানায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিলেন । তাকে অননুমোদিত অনুপস্থিত দেখিয়ে আমরা গত জুনেই থানা থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলাম। সে মোটেও ভালো লোক না।”

‎একই থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. এমদাদুল হকও নিশ্চিত করেন যে, শফিকুল থানায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চরম অনিয়মিত, বেপরোয়া ও উশৃঙ্খল ছিলেন।



‎মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার এসআই শাহিনুর রহমান জানান, এ ঘটনায় সোমবার (২৪ আগস্ট) দুই আসামির নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জনকে আসামি করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।

‎গতকালই আসামিদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সোপর্দ করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাদের জামিন আবেদন নাকচ করে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

‎মামলার এজাহার ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ধৃত এএসআই শফিকুল তার পদের প্রভাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাদকের বড় বড় চালান কোনো বাধা ছাড়াই ঢাকায় নিয়ে আসতেন । পরবর্তীতে সহযোগী ওয়াসিমের মাধ্যমে উত্তরার দক্ষিণখান ও আশপাশের এলাকায় তা পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করতেম। এই চক্রের নেপথ্যে থাকা বাকি গডফাদার ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খুব দ্রুতই রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শহীদ জিয়ার প্রথম মাজারে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির শ্রদ্ধা

পোশাকে পুলিশ, নেপথ্যে মাদকের কারবারি

আপডেট সময় : ০৫:০৫:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

উত্তররায় ৫৩১০ ইয়াবাসহ পল্লবী থানার এএসআই গ্রেপ্তার

বিশেষ প্রতিনিধি :

রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন অপরাধের ডালপালা কত দ্রুত ছড়াতে পারে, তার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ মিলল খোদ রাজধানীতে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পল্লবী থানার এক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) এখন নিজেই শ্রীঘরে, তাও আবার ৫ হাজার ৩১০ পিস ইয়াবার এক বিশাল চালানসহ। গ্রেপ্তারকৃত ওই পুলিশ কর্মকর্তার নাম মো. শফিকুল ইসলাম (৪৩) । তার সাথে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এই মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী ওয়াসিম (২৪) নামের এক তরুণকেও।

‎গত রবিবার (২৩ আগস্ট) গভীর রাতে উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় এক নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর যৌথ অভিযান চালিয়ে দক্ষিণখান থানা পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে । তবে তদন্তের স্বার্থে পুরো বিষয়টি গোপন রাখার পর আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি নিশ্চিত করেছেন দক্ষিণখান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বখতিয়ার হোসেন।


‎তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েকদিন ধরে উত্তরার দক্ষিণখান ও আজমপুর এলাকায় একটি বড় ধরনের মাদকের চালান বেচাকেনা হওয়ার সুনির্দিষ্ট গোপন তথ্য ছিল পুলিশের কাছে। সেই তথ্যের সূত্র ধরে রবিবার রাতে আজমপুর কাঁচাবাজার এলাকায় সাদা পোশাকে ওত পেতে থাকে দক্ষিণখান থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল।

‎রাত গভীর হতেই পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ওয়াসিম নামের এক যুবক আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে । পুলিশ সদস্যরা ধাওয়া দিয়ে তাকে কোণঠাসা করে ফেলে এবং তল্লাশি চালিয়ে তার পকেট থেকে প্রথম ৫০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ।

‎আটকের পর পুলিশের পেশাদার জেরার মুখে ভেঙে পড়ে ওয়াসিম। সে স্বীকার করে, তারা মূলত একটি বড় সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করছে, যার প্রধান চালিকাশক্তি খোদ একজন পুলিশ কর্মকর্তা। ওয়াসিমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কালবিলম্ব না করে উত্তরার একটি নির্দিষ্ট ভাড়া বাসায় ঝটিকা অভিযান চালায় পুলিশ । সেখান থেকেই হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় এএসআই শফিকুল ইসলামকে এবং তার দেহ তল্লাশি করে উদ্ধার হয় আরও ২০০ পিস ইয়াবা ।

‎কিন্তু নাটকের এখানেই শেষ ছিল না। ধৃত দুজনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার পর মধ্যরাতে আজমপুর কাঁচাবাজারের বিসমিল্লাহ পল্লীর ‘নূর বিল্ডিং’-এর ৬৭ নম্বর ফ্ল্যাটে চূড়ান্ত অভিযান চালানো হয় । সেই ফ্ল্যাটের ভেতর বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা অবস্থা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও ৫ হাজার ১১০ পিস ইয়াবা । তিন দফার এই সাঁড়াশি অভিযানে সর্বমোট ৫,৩১০ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়, যার বাজারমূল্য লাখ লাখ টাকা ।



‎একজন দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা কোনো প্রকার ভয়ডর ছাড়াই এভাবে সরাসরি মাদক চালানের সাথে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় খোদ পুলিশ বিভাগের ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় শুরু হয়েছে।

‎গ্রেপ্তারকৃত এএসআই শফিকুলের ট্র্যাক রেকর্ড নিয়ে জানতে চাওয়া হলে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “শফিকুল ইসলাম গত জুনের ৮ তারিখে এই থানায় বদলি হয়ে এসেছিলেন। কিন্তু যোগদানের পর থেকেই তিনি দায়িত্ব পালনে চরম গাফিলতি ও অনীহা দেখাতেন। মাত্র দুই-তিন দিন ডিউটি করার পর অসুস্থতার সস্তা অজুহাত দেখিয়ে গত ২১ জুন থেকে তিনি থানায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিলেন । তাকে অননুমোদিত অনুপস্থিত দেখিয়ে আমরা গত জুনেই থানা থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলাম। সে মোটেও ভালো লোক না।”

‎একই থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. এমদাদুল হকও নিশ্চিত করেন যে, শফিকুল থানায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চরম অনিয়মিত, বেপরোয়া ও উশৃঙ্খল ছিলেন।



‎মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার এসআই শাহিনুর রহমান জানান, এ ঘটনায় সোমবার (২৪ আগস্ট) দুই আসামির নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জনকে আসামি করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।

‎গতকালই আসামিদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সোপর্দ করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাদের জামিন আবেদন নাকচ করে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

‎মামলার এজাহার ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ধৃত এএসআই শফিকুল তার পদের প্রভাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাদকের বড় বড় চালান কোনো বাধা ছাড়াই ঢাকায় নিয়ে আসতেন । পরবর্তীতে সহযোগী ওয়াসিমের মাধ্যমে উত্তরার দক্ষিণখান ও আশপাশের এলাকায় তা পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করতেম। এই চক্রের নেপথ্যে থাকা বাকি গডফাদার ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খুব দ্রুতই রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।