রাসেল চৌধুরী
ইতিহাসের ধূলিকণা মলিন হয়, সভ্যতার ইমারত ভেঙে পড়ে, কিন্তু চৌদ্দশত বছর আগে আরবের তপ্ত মরুভূমিতে মক্কার কুরাইশ বংশের এক জীর্ণ কুটিরে মা আমেনার কোলে যে আলোর অবয়ব ফুটে উঠেছিল—তার দ্যুতি আজো অম্লান, চিরভাস্বর।
১২ই রবিউল আউয়াল—পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। এটি কেবল পঞ্জিকার পাতায় আটকে থাকা কোনো সাধারণ দিন নয়; সুন্নি সুফি ঘরানার কোটি কোটি আশেকে রাসূলের কাছে এটি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম আনন্দের দিন, সৃষ্টির রূহানি বসন্ত।বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে—ইয়েমেনের সানার প্রাচীন গলি থেকে শুরু করে কায়রোর আল-আজহার স্কয়ার, ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের সবুজ প্রান্তর কিংবা বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাজপথ—আজ সর্বত্রই লাখো-কোটি কণ্ঠের সমবেত সুর: ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আয়নায় ‘জশনে জুলুস’ অনেকেই জশনে জুলুস (ধর্মীয় আনন্দ শোভাযাত্রা) এবং মিলাদুন্নবী উদযাপনকে আধুনিক প্রথা মনে করে ভুল করেন। কিন্তু সুন্নি সুফি আকিদা ও শাস্ত্রীয় দলিলের গভীরতায় ডুব দিলে দেখা যায়, এর শিকড় সরাসরি কুরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের সাথে যুক্ত।
পবিত্র কুরআনের প্রামাণ্য দলিল আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন:“বলুন, আল্লাহর দয়া (ফযল) ও রহমত প্রাপ্তিতে তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।”সুন্নি মুফাসসিরিনদের মতে, সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বড় ‘রহমত’ আর কেউ হতে পারে না। কারণ, আল্লাহ নিজেই সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন—“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।” অতএব, রহমত হিসেবে নবীজির আগমনী দিনে আনন্দ প্রকাশ করা সরাসরি আল্লাহর নির্দেশেরই এক অনন্য বাস্তব রূপ।
ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বড় ‘জশনে জুলুস’ করেছিলেন স্বয়ং মদিনার আনসার সাহাবিরা। প্রিয় নবীজি (সা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনা মুনাওয়ারায় প্রবেশ করছিলেন, তখন মদিনার সর্বস্তরের মানুষ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা আল্লাহর রাসূলকে স্বাগত জানাতে ঘর থেকে বের হয়ে রাজপথে চলে এসেছিলেন।
সাহাবিরা সেদিন দফ বাজিয়ে
( স্লোগান দিয়ে নবীজিকে মদিনায় বরণ করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসের সেই প্রথম ও ঐতিহাসিক জুলুসে সমবেত কণ্ঠে যে কাসিদাটি গাওয়া হয়েছিল, তা আজো বিশ্বজুড়ে অমর হয়ে আছে:“ত্বলা’আল বাদরু ‘আলাইনা, মিন সানিয়্যাতিল ওয়াদা’অজাবাশ শুকরু ‘আলাইনা, মা دا’আ লিল্লাহি دا’।”(অর্থ: ওদাই উপত্যকা থেকে আমাদের মাঝে পূর্ণিমার চাঁদের উদয় হয়েছে; আমাদের ওপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব, যতদিন আল্লাহর দরবারে কোনো আহবানকারী আহবান করবে।
হুজুর (সা.) সাহাবিদের এই সমবেত আনন্দ মিছিল বা জুলুসকে নিষেধ করেননি, বরং মুচকি হেসে তা অনুমোদন করেছিলেন।
সুন্নি দর্শনে এটিই হলো জুলুসের সবচেয়ে বড় সুন্নতি দলিল। বিশ্ব মানচিত্রে তিন মুসলিম দেশের মওলিদ ঐতিহ্য ও বিখ্যাত কাসিদাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই মিলাদুন্নবী ও জুলুস কীভাবে সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে, তা সত্যিই অতুলনীয়।
রোবটের যান্ত্রিক ডেটার বাইরে গিয়ে যদি আমরা এই দেশগুলোর আধ্যাত্মিক সুবাস অনুভব করি, তবে এক ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে । মদিনা শরিফে রবিউল আউয়াল মাসজুড়েই এক স্বর্গীয় পরিবেশ বিরাজ করে। মদিনার ঘরে ঘরে, বিশেষ করে মসজিদে নববীর আশপাশের প্রাচীন সুন্নি পরিবারগুলোতে এই রাতে ‘মিলাদ শরিফ’ পাঠ করা হয়। মদিনার বিখ্যাত সুফি আলেম আল্লামা হাবিব উমর বিন হাফিজ রচিত বিখ্যাত কাসিদা ‘আদ-দিয়াউল লামি’ অত্যন্ত ভক্তিভরে সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয়। এছাড়া মসজিদে নববীর খাদেম ও প্রাচীন সুফি তরিকার অনুসারীরা সুগন্ধি ও গোলাপজল ছিটিয়ে মদিনার গলিতে দুরুদের ধবনি তোলেন।
রাজকীয় জুলুস ও কাসিদা বুর্দাউত্তরের দেশ মরক্কোতে মিলাদুন্নবীকে বলা হয় ‘আইদ আল-মাওলিদ’। মরক্কোর রাজপরিবার শত শত বছর ধরে এই দিনে এক বিশাল রাজকীয় জুলুসের আয়োজন করে। মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক জিলাবা পরে হাজার হাজার মানুষ মোমবাতি ও রঙিন ফানুস হাতে রাস্তায় নেমে আসেন।মরক্কোর মিলাদ মাহফিলের মূল আকর্ষণ হলো ইমাম বুসিরি (রহ.)-এর বিশ্ববিখ্যাত ‘কাসিদা বুর্দা’ । বিশেষ করে এই শ্লোকটি যখন লাখো মরক্কোবাসী সমবেত সুরে গেয়ে ওঠেন, তখন এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক আবহের সৃষ্টি হয়:“মাওলা ইয়া সাল্লি অ সাল্লিম দাইমান আবাদাআ’লা হাবিবিকা খাইরিল খালকি কুল্লিহীমি।”(অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! তোমার প্রিয় হাবিবের ওপর সর্বদা, চিরকাল দুরুদ ও সালাম বর্ষণ করো, যিনি সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।
উসমানীয় খিলাফতের সময় থেকেই তুরস্কে মিলাদুন্নবী অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। তুর্কি ভাষায় এই রাতকে বলা হয় ‘মেভলিদ কান্দিলি’ বা আলোর উৎসব। এই রাতে ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদ মসজিদ (ব্লু মস্ক) এবং আয়া সোফিয়াসহ দেশের সব ঐতিহাসিক মসজিদের মিনারগুলো আলো দিয়ে সাজানো হয়।তুর্কিদের মিলাদ উদযাপনের প্রধান আকর্ষণ হলো চতুর্দশ শতাব্দীর সুফি কবি সুলেইমান চেলেবি রচিত মহাকাব্যিক কাসিদা ‘ভেসিল्याতুন-নেজাত’ বা মুক্তির উসিলা। এটি তুর্কি সুর ও সানাইয়ের মূর্ছনায় গাওয়া হয়। এর পাশাপাশি সুফি সাধক মাওলানা জালালুদ্দিনের দেশের মানুষ হিসেবে তুর্কিরা ঐতিহ্যবাহী ‘সেমা’ আধ্যাত্মিক নৃত্যের মাধ্যমে আল্লাহর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে।
ইসলামের এই পরম সুন্দর সংস্কৃতিগুলোর বিরুদ্ধে একদল সংকীর্ণমনা লোক বরাবরই ‘বিদআত’ ফতোয়া ছুড়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করে। সুন্নি মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মতের ইজমার ভিত্তিতে এই অপবাদের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন সর্বযুগে। তাদের প্রশ্ন “নবীজি বা সাহাবিরা এভাবে প্রতি বছর দিন নির্দিষ্ট করে জশনে জুলুস বা মিলাদ করেননি।”জবাব: ইসলামে যেকোনো ভালো কাজের সূচনা করা যা শরিয়তের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়, তা মোটেও নিষিদ্ধ নয়। সহিহ মুসলিম শরিফের হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে কোনো ভালো নিয়মের প্রচলন করল, সে এর সওয়াব পাবে এবং তার পরে যারা এর ওপর আমল করবে তাদের সওয়াবও সে পাবে।
মিলাদ ও জুলুসে কী হয়? কুরআন তিলাওয়াত, দুরুদ পাঠ, নবীজির জীবনী আলোচনা এবং মানুষকে খাবার খাওয়ানো হয়। এর প্রতিটি কাজই পৃথক পৃথকভাবে কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এই ভালো কাজগুলো একসাথে সমবেতভাবে করার মধ্যে কোনো হারাম উপাদান নেই।
আপত্তি ২: “ইসলামে ঈদ তো মাত্র দুটি (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা), তবে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ কেন?”জবাব: ‘ঈদ’ শব্দের শাব্দিক অর্থ আনন্দ বা উৎসবের দিন। সুন্নি আকিদায় এটি ইবাদতের পরিভাষার দুটি ঈদের স্থলাভিষিক্ত বা বিকল্প নয়, বরং এটি নিয়ামতের শুকরিয়াস্বরূপ মহিমান্বিত আনন্দের দিন। সহিহ বুখারি শরিফে এসেছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখত কারণ সেই দিনে হযরত মুসা (আ.) ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। নবীজি (সা.) মদিনায় এসে তাদের দেখে বললেন, “মুসা (আ.)-এর আনন্দের শরিক হওয়ার হক আমাদের বেশি।” এরপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন ও সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর একজন নবীর মুক্তির দিন যদি প্রতি বছর স্মরণের মাধ্যমে আনন্দ বা ইবাদতের দিন হতে পারে, তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালিনের এই ধরায় আগমনের দিনটি কেন আনন্দের দিন (ঈদ) হবে না।
আপত্তি ৩: “ইসলামে মিছিল বা শোভাযাত্রার কোনো স্থান নেই।”জবাব: হযরত ওমর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম মক্কার কাফেরদের সামনে নিজেদের শক্তি ও সত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে দুটি সারিতে বিভক্ত হয়ে মিছিল করে কাবা শরিফে প্রবেশ করেছিলেন। যার এক সারির নেতৃত্বে ছিলেন হযরত হামজা (রা.) এবং অন্য সারির নেতৃত্বে ছিলেন হযরত ওমর (রা.)। এটিই ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম প্রকাশ্য ঈমানি মিছিল।
জশনে জুলুসও মূলত বাতিলের বিরুদ্ধে উম্মতের একতার এক বিশাল আধ্যাত্মিক মহড়া। বৈশ্বিক মানচিত্রে চট্টগ্রামের ৫৫ বছরের অলৌকিক জশনে জুলুসবিশ্বের ইতিহাসে জশনে জুলুসের আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণে সবচেয়ে বড় কীর্তি গড়েছে বাংলাদেশের চাটগাঁর মাটি। ১৯৭৪ সালে তরিকতের অন্যতম দিকপাল, আওলাদে রাসূল, পীরে কামিল আল্লামা হাফেজ সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রহ.) আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশে প্রথম এই ঐতিহাসিক জুলুসের সূচনা করেন।
অন্যদিকে ইয়েমেন মিশর কিংবা সিরিয়াতেও মিলাদের বড় বড় জমায়েত হয়, কিন্তু একক কোনো মহানগরের বুকে কোনো প্রকার রাষ্ট্রীয় জবরদস্তি বা রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই কেবল রূহানি টানে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের সুশৃঙ্খল মহাসমুদ্র তৈরি হওয়া—পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল অলৌকিক ঘটনা।
সকাল ৯ টায় আলমগীর খানকাহ থেকে বর্তমান সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই জুলুস সাড়ে দচ টার মধ্যেই বহদ্দারহাট থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত পুরো শহরকে সবুজ নিশানে ঢেকে দেয় । এই মহাসমাবেশের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর অলৌকিক শৃঙ্খলা। তিল ধারণের জায়গা নেই, অথচ কোথাও কোনো ঠেলাঠেলি বা উগ্রতা নেই।
আনজুমান ট্রাস্টের প্রায় ১০ হাজার সাদা পোশাকধারী স্বেচ্ছাসেবক এবং সিএমপির কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এই আয়োজন অহিংসা ও পরম নবীপ্রেমের এক বিশ্বমঞ্চে পরিণত হয়েছে ।
উম্মাহর ঐক্যের রূহানি সুতোইয়েমেনের সানার প্রাচীন পাথুরে দেওয়াল থেকে শুরু করে মরক্কোর রাজপথ, তুরস্কের ইস্তাম্বুল কিংবা বাংলাদেশের চট্টগ্রামের লাখো লাখো মানুষের জশনে জুলুস—সবকিছুর মূল সুর একটিই: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা বা ‘ইশকে রাসূল’। আজ দুপুর গড়িয়ে যোহরের নামাজের পর যখন লাখ লাখ আশেকে রাসূলের চোখ ভেজা মোনাজাতের মাধ্যমে এই মহাসমাগম শেষ হবে, তখন চাটগাঁর ধূলিকণায় আরও এক বছরের জন্য লেপ্টে থাকবে কোটি ভক্তের সেই চিরন্তন সুর—‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’।
মরুর সূর্য থেকে চাটগাঁর রাজপথ: কুরআন-হাদিস ও বিশ্ব-ঐতিহ্যের আয়নায় পবিত্র জশনে জুলুস
জনপ্রিয় সংবাদ















