ঢাকা ০৫:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সবুজ নিশান আর দুরুদের ঢেউয়ে ভাসছে বন্দরনগরী

  • আপডেট সময় : ০৪:৫৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
  • 8

 চট্টগ্রামে ৫৫তম জশনে জুলুসের বিশ্বরেকর্ড ছোঁয়া জনসমুদ্র

নিজস্ব প্রতিবেদক :

পাহাড় আর সাগরের মেলবন্ধনে গড়া এই শহর আজ ভোরে ঘুম থেকে ওঠেনি, বরং রাতের অন্ধকার ফুরিয়ে আসার আগেই জেগে উঠেছে এক অভূতপূর্ব জাগরণে। বাতাসে ভেসে আসা কর্পূরের সুবাস, মাইকে সমবেত দুরুদ-সালামের সুর আর আকাশে পতপত করে উড়তে থাকা লাখো সবুজ নিশান জানান দিচ্ছিল—আজ চাটগাঁর বুকে ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় রচনার দিন।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আজ বুধবার (২৬ আগস্ট ) বন্দরনগরী চট্টগ্রাম সাক্ষী হচ্ছে তার ৫৫তম জশনে জুলুসের, যা ইতিমধ্যেই উপস্থিতির দিক থেকে যেকোনো আন্তর্জাতিক সমাবেশকে টেক্কা দেওয়ার সামর্থ্য জানান দিচ্ছে।ভোর ৫টার পর থেকেই মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট ও জিইসি মোড়ের পিচঢালা রাজপথগুলো আর চেনা যাচ্ছিল না। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষের কাফেলা বাস, মিনিট্রাক আর পায়ে হেঁটে এসে মিশে যাচ্ছিল এক মোহনায়। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সকাল সাড়ে ৯টা।

নগরীর ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকাহ থেকে জুলুসটি যখন মূল সড়কে পা বাড়ায়, তখন লাখো মানুষের কণ্ঠে একযোগে ধ্বনিত হয় ‘মারহাবা, ইয়া রাসূলাল্লাহ’। এবারের ঐতিহাসিক এই জুলুসের সম্মুখভাগে থেকে সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন দরবারে সিরিকোটের সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ ও শাহজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ আকিব আহমেদ শাহ।সকাল ১০:৩০ মিনিট: বহদ্দারহাট থেকে লালখান বাজার এখন এক জীবন্ত মহাসমুদ্রসর্বশেষ মাঠে থাকা সাংবাদিকদের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টা বাজতেই জুলুসের মূল বহরটি মুরাদপুর ও ২ নম্বর গেট পার হয়ে জিইসি মোড়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

জনস্রোতের তীব্রতা এতটাই বেশি যে, জুলুসের পেছনের অংশ এখনো বহদ্দারহাট ও ষোলশহর এলাকা ছাড়াতে পারেনি। অর্থাৎ, মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো রুটটি এক অবিচ্ছিন্ন ও অভূতপূর্ব জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। উপর থেকে তাকালে মনে হচ্ছে, পুরো চট্টগ্রাম শহর যেন এক বিশাল সবুজ চাদরে ঢেকে গেছে।

আঞ্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নীয়া ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের ধারণা, এই মুহূর্তে রাজপথে উপস্থিতি ৫০ লাখের ঘর ছুঁইছুঁই করছে।তিল ধারণের জায়গা নেই, অথচ এই মহাসমাবেশের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর অলৌকিক শৃঙ্খলা। কোথাও কোনো ঠেলাঠেলি বা উগ্রতা নেই। আনজুমান ট্রাস্টের প্রায় ১০ হাজার সাদা পোশাকধারী স্বেচ্ছাসেবক লাঠি হাতে ট্রাফিকের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাঁধে নিয়ে অত্যন্ত সুচারুভাবে জনস্রোতের গতিপথ সচল রাখছেন।

নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র চাদর ও প্রশাসনের সতর্কতাবিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ও আয়োজক কমিটি কঠোরতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে জুলুস চলাকালীন লালখান বাজার-মুরাদপুর ফ্লাইওভারে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সাথে নগরজুড়ে সব ধরনের অস্ত্র বহন, প্রদর্শন ও মানুষের অবয়ব বা কুশপুত্তলিকা প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল প্রশাসন। পুরো রুট জুড়ে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি ও সিসিটিভি ক্যামেরার কঠোর অবস্থান চোখে পড়ার মতো।সম্প্রীতি আর মানবিকতার চাটগাঁ মেজাজচট্টগ্রামের চিরায়ত মেজাজ যে আতিথেয়তা ও সম্প্রীতির, তার প্রমাণ মিলছে রাজপথের মোড়ে মোড়ে। শুধু মুসলিম তরুণরাই নন, অনেক জায়গায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে স্থানীয় হিন্দু-বৌদ্ধ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ ক্লান্ত মুসল্লিদের তৃষ্ণা মেটাতে ঠান্ডা শরবত, বিশুদ্ধ পানি ও চকলেট বিতরণ করছেন। জিইসি মোড়ে শরবত বিতরণকারী তরুণ রাশেদ বলেন, “এটা আমাদের চাটগাঁর ঐতিহ্য। দূর-দূরান্ত থেকে মেহমানরা এসেছেন আমাদের নবীজির ভালোবাসায়, তাদের সেবা করতে পারা আমাদের সৌভাগ্য।”

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শহীদ জিয়ার প্রথম মাজারে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির শ্রদ্ধা

সবুজ নিশান আর দুরুদের ঢেউয়ে ভাসছে বন্দরনগরী

আপডেট সময় : ০৪:৫৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

 চট্টগ্রামে ৫৫তম জশনে জুলুসের বিশ্বরেকর্ড ছোঁয়া জনসমুদ্র

নিজস্ব প্রতিবেদক :

পাহাড় আর সাগরের মেলবন্ধনে গড়া এই শহর আজ ভোরে ঘুম থেকে ওঠেনি, বরং রাতের অন্ধকার ফুরিয়ে আসার আগেই জেগে উঠেছে এক অভূতপূর্ব জাগরণে। বাতাসে ভেসে আসা কর্পূরের সুবাস, মাইকে সমবেত দুরুদ-সালামের সুর আর আকাশে পতপত করে উড়তে থাকা লাখো সবুজ নিশান জানান দিচ্ছিল—আজ চাটগাঁর বুকে ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় রচনার দিন।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আজ বুধবার (২৬ আগস্ট ) বন্দরনগরী চট্টগ্রাম সাক্ষী হচ্ছে তার ৫৫তম জশনে জুলুসের, যা ইতিমধ্যেই উপস্থিতির দিক থেকে যেকোনো আন্তর্জাতিক সমাবেশকে টেক্কা দেওয়ার সামর্থ্য জানান দিচ্ছে।ভোর ৫টার পর থেকেই মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট ও জিইসি মোড়ের পিচঢালা রাজপথগুলো আর চেনা যাচ্ছিল না। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষের কাফেলা বাস, মিনিট্রাক আর পায়ে হেঁটে এসে মিশে যাচ্ছিল এক মোহনায়। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সকাল সাড়ে ৯টা।

নগরীর ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকাহ থেকে জুলুসটি যখন মূল সড়কে পা বাড়ায়, তখন লাখো মানুষের কণ্ঠে একযোগে ধ্বনিত হয় ‘মারহাবা, ইয়া রাসূলাল্লাহ’। এবারের ঐতিহাসিক এই জুলুসের সম্মুখভাগে থেকে সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন দরবারে সিরিকোটের সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ ও শাহজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ আকিব আহমেদ শাহ।সকাল ১০:৩০ মিনিট: বহদ্দারহাট থেকে লালখান বাজার এখন এক জীবন্ত মহাসমুদ্রসর্বশেষ মাঠে থাকা সাংবাদিকদের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টা বাজতেই জুলুসের মূল বহরটি মুরাদপুর ও ২ নম্বর গেট পার হয়ে জিইসি মোড়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

জনস্রোতের তীব্রতা এতটাই বেশি যে, জুলুসের পেছনের অংশ এখনো বহদ্দারহাট ও ষোলশহর এলাকা ছাড়াতে পারেনি। অর্থাৎ, মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো রুটটি এক অবিচ্ছিন্ন ও অভূতপূর্ব জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। উপর থেকে তাকালে মনে হচ্ছে, পুরো চট্টগ্রাম শহর যেন এক বিশাল সবুজ চাদরে ঢেকে গেছে।

আঞ্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নীয়া ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের ধারণা, এই মুহূর্তে রাজপথে উপস্থিতি ৫০ লাখের ঘর ছুঁইছুঁই করছে।তিল ধারণের জায়গা নেই, অথচ এই মহাসমাবেশের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর অলৌকিক শৃঙ্খলা। কোথাও কোনো ঠেলাঠেলি বা উগ্রতা নেই। আনজুমান ট্রাস্টের প্রায় ১০ হাজার সাদা পোশাকধারী স্বেচ্ছাসেবক লাঠি হাতে ট্রাফিকের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাঁধে নিয়ে অত্যন্ত সুচারুভাবে জনস্রোতের গতিপথ সচল রাখছেন।

নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র চাদর ও প্রশাসনের সতর্কতাবিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ও আয়োজক কমিটি কঠোরতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে জুলুস চলাকালীন লালখান বাজার-মুরাদপুর ফ্লাইওভারে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সাথে নগরজুড়ে সব ধরনের অস্ত্র বহন, প্রদর্শন ও মানুষের অবয়ব বা কুশপুত্তলিকা প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল প্রশাসন। পুরো রুট জুড়ে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি ও সিসিটিভি ক্যামেরার কঠোর অবস্থান চোখে পড়ার মতো।সম্প্রীতি আর মানবিকতার চাটগাঁ মেজাজচট্টগ্রামের চিরায়ত মেজাজ যে আতিথেয়তা ও সম্প্রীতির, তার প্রমাণ মিলছে রাজপথের মোড়ে মোড়ে। শুধু মুসলিম তরুণরাই নন, অনেক জায়গায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে স্থানীয় হিন্দু-বৌদ্ধ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ ক্লান্ত মুসল্লিদের তৃষ্ণা মেটাতে ঠান্ডা শরবত, বিশুদ্ধ পানি ও চকলেট বিতরণ করছেন। জিইসি মোড়ে শরবত বিতরণকারী তরুণ রাশেদ বলেন, “এটা আমাদের চাটগাঁর ঐতিহ্য। দূর-দূরান্ত থেকে মেহমানরা এসেছেন আমাদের নবীজির ভালোবাসায়, তাদের সেবা করতে পারা আমাদের সৌভাগ্য।”