ঢাকা ০১:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‎লাখো প্রাণের স্পন্দন আর অনন্য শৃঙ্খলার মহাকাব্য: চট্টগ্রামে জশনে জুলুসের প্রেমের মহাসমুদ্র

  • আপডেট সময় : ১০:৪২:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
  • 17

‎নিজস্ব প্রতিবেদক

‎দৃষ্টির সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই যেন শুরু হয়েছে সবুজের এক অন্তহীন কাফেলা। কোনো জাগতিক প্রলোভন নেই, নেই কোনো রাষ্ট্রীয় বা আইনি বাধ্যবাধকতা। কেবলই হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অলৌকিক ভালোবাসার টানে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাজপথ রূপ নিয়েছে লাখো আশেকে রাসুলের এক জীবন্ত মহাসমুদ্রে। পবিত্র জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উপলক্ষে বন্দরনগরী আজ দেখলো এক অপার্থিব সম্প্রীতি, শৃঙ্খলা আর মানবতার মেলবন্ধন।

‎আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নি ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছরের মতো এবারও ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা ময়দান থেকে শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই ধর্মীয় শোভাযাত্রা। সকালে হুজুর কেবলার পিস কারের (গাড়ি) অগ্রগমনের সাথে সাথে মুরাদপুর, চকবাজার, ওয়াসা ও জিইসি মোড়সহ নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলো জনজোয়ারে ভেসে যায়। বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে লাখো কণ্ঠের সমবেত দরুদ আর নাত-এ রাসুলের সুমধুর সুর।

‎যেখানে কয়েক হাজার মানুষের সমাবেশেই বিশৃঙ্খলা বা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়, সেখানে লাখ লাখ মানুষের এই মহাসমুদ্রে আজ দেখা গেছে পিনপতন শৃঙ্খলা। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ এবং আনজুমান সিকিউরিটি ফোর্সের (ASF) হাজার হাজার তরুণ স্বেচ্ছাসেবক নিজেদের হাত ধরাধরি করে তৈরি করেছিলেন এক অভেদ্য মানব-দেয়াল। কোনো পুলিশি লাঠিচার্জ বা কঠোরতা ছাড়াই, কেবল এক আত্মিক অনুশাসনে পুরো জনস্রোত এগিয়ে গেছে একই তালে, একই ছন্দে।


‎জুলুসের মূল সৌন্দর্য ছিল এর মানবিক ও বৈচিত্র্যময় রূপ। তীব্র রোদ আর দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি দূর করতে চট্টগ্রামের সাধারণ নাগরিকেরা আজ ঘরের দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে নিজ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছিল শরবত, পানি আর হালকা খাবারের বুথ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য ছিল নগরীর বহুতল ভবনগুলোর বারান্দা কিংবা ছাদ থেকে দড়ি দিয়ে বালতিতে করে পানির বোতল নিচে নামিয়ে দেওয়ার দৃশ্য। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সাত-আট বছরের শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ তৃষ্ণার্ত মোসল্লিদের মুখে তুলে দিচ্ছিলেন চকলেট ও খেজুর। এই উৎসব যেন কেবল নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডির নয়, বরং পুরো চট্টগ্রামের এক পরম সামাজিক মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছিল।

‎দীর্ঘ পথ চলায় প্রবীণ কিংবা ক্লান্ত কোনো মোসল্লি যেন দুর্ভোগে না পড়েন, সেজন্য এবার গড়ে তোলা হয়েছিল এক নিশ্ছিদ্র সেবা বলয়। গাউসিয়া কমিটির ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম, পর্যাপ্ত হুইলচেয়ার এবং বিশেষ ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পুরো জুলুসজুড়ে অবস্থান নেয়। রাস্তায় হঠাৎ কেউ অসুস্থ বোধ করলেই স্বেচ্ছাসেবকেরা পরম যত্নে তাকে মেডিকেল ক্যাম্পে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

‎দুপুরের কড়া রোদ উপেক্ষা করে জুলুস যখন আবার জামেয়া ময়দানে এসে সমবেত হয়, তখন চেনা মাঠটি রূপ নেয় এক কান্নার নদীতে। তপ্ত রোদে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন লাখো হাত একসাথে আকাশের দিকে ওঠে, তখন এক অপার্থিব স্তব্ধতা নেমে আসে পুরো নগরীতে। হুজুর কেবলার কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে আখেরি মোনাজাতে দেশ, জাতি এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য স্রষ্টার দরবারে আকুল আকুতি জানানো হয়। মোনাজাতের প্রতিটি ‘আমিন’ ধ্বনিতে যেন কেঁপে উঠছিল আকাশ-বাতাস।

‎মোনাজাত শেষ হতেই দেখা গেল আরও এক অনন্য নজির। মাঠ ছাড়ার আগে সাধারণ মোসল্লিরা স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে মিলে পুরো ময়দানের প্লাস্টিকের বোতল ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে ডাস্টবিনে জমা করেন।

‎চট্টগ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুস কেবল একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা নয়; এটি শান্তি, সম্প্রীতি, পরিচ্ছন্নতা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক জীবন্ত ইশতেহার। এই ভক্তি আর মানবিকতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়—এমনটাই প্রতিধ্বনি আজ চট্টগ্রামজুড়ে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শহীদ জিয়ার প্রথম মাজারে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির শ্রদ্ধা

‎লাখো প্রাণের স্পন্দন আর অনন্য শৃঙ্খলার মহাকাব্য: চট্টগ্রামে জশনে জুলুসের প্রেমের মহাসমুদ্র

আপডেট সময় : ১০:৪২:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

‎নিজস্ব প্রতিবেদক

‎দৃষ্টির সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই যেন শুরু হয়েছে সবুজের এক অন্তহীন কাফেলা। কোনো জাগতিক প্রলোভন নেই, নেই কোনো রাষ্ট্রীয় বা আইনি বাধ্যবাধকতা। কেবলই হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অলৌকিক ভালোবাসার টানে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাজপথ রূপ নিয়েছে লাখো আশেকে রাসুলের এক জীবন্ত মহাসমুদ্রে। পবিত্র জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উপলক্ষে বন্দরনগরী আজ দেখলো এক অপার্থিব সম্প্রীতি, শৃঙ্খলা আর মানবতার মেলবন্ধন।

‎আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নি ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছরের মতো এবারও ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা ময়দান থেকে শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই ধর্মীয় শোভাযাত্রা। সকালে হুজুর কেবলার পিস কারের (গাড়ি) অগ্রগমনের সাথে সাথে মুরাদপুর, চকবাজার, ওয়াসা ও জিইসি মোড়সহ নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলো জনজোয়ারে ভেসে যায়। বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে লাখো কণ্ঠের সমবেত দরুদ আর নাত-এ রাসুলের সুমধুর সুর।

‎যেখানে কয়েক হাজার মানুষের সমাবেশেই বিশৃঙ্খলা বা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়, সেখানে লাখ লাখ মানুষের এই মহাসমুদ্রে আজ দেখা গেছে পিনপতন শৃঙ্খলা। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ এবং আনজুমান সিকিউরিটি ফোর্সের (ASF) হাজার হাজার তরুণ স্বেচ্ছাসেবক নিজেদের হাত ধরাধরি করে তৈরি করেছিলেন এক অভেদ্য মানব-দেয়াল। কোনো পুলিশি লাঠিচার্জ বা কঠোরতা ছাড়াই, কেবল এক আত্মিক অনুশাসনে পুরো জনস্রোত এগিয়ে গেছে একই তালে, একই ছন্দে।


‎জুলুসের মূল সৌন্দর্য ছিল এর মানবিক ও বৈচিত্র্যময় রূপ। তীব্র রোদ আর দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি দূর করতে চট্টগ্রামের সাধারণ নাগরিকেরা আজ ঘরের দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে নিজ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছিল শরবত, পানি আর হালকা খাবারের বুথ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য ছিল নগরীর বহুতল ভবনগুলোর বারান্দা কিংবা ছাদ থেকে দড়ি দিয়ে বালতিতে করে পানির বোতল নিচে নামিয়ে দেওয়ার দৃশ্য। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সাত-আট বছরের শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ তৃষ্ণার্ত মোসল্লিদের মুখে তুলে দিচ্ছিলেন চকলেট ও খেজুর। এই উৎসব যেন কেবল নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডির নয়, বরং পুরো চট্টগ্রামের এক পরম সামাজিক মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছিল।

‎দীর্ঘ পথ চলায় প্রবীণ কিংবা ক্লান্ত কোনো মোসল্লি যেন দুর্ভোগে না পড়েন, সেজন্য এবার গড়ে তোলা হয়েছিল এক নিশ্ছিদ্র সেবা বলয়। গাউসিয়া কমিটির ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম, পর্যাপ্ত হুইলচেয়ার এবং বিশেষ ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পুরো জুলুসজুড়ে অবস্থান নেয়। রাস্তায় হঠাৎ কেউ অসুস্থ বোধ করলেই স্বেচ্ছাসেবকেরা পরম যত্নে তাকে মেডিকেল ক্যাম্পে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

‎দুপুরের কড়া রোদ উপেক্ষা করে জুলুস যখন আবার জামেয়া ময়দানে এসে সমবেত হয়, তখন চেনা মাঠটি রূপ নেয় এক কান্নার নদীতে। তপ্ত রোদে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন লাখো হাত একসাথে আকাশের দিকে ওঠে, তখন এক অপার্থিব স্তব্ধতা নেমে আসে পুরো নগরীতে। হুজুর কেবলার কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে আখেরি মোনাজাতে দেশ, জাতি এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য স্রষ্টার দরবারে আকুল আকুতি জানানো হয়। মোনাজাতের প্রতিটি ‘আমিন’ ধ্বনিতে যেন কেঁপে উঠছিল আকাশ-বাতাস।

‎মোনাজাত শেষ হতেই দেখা গেল আরও এক অনন্য নজির। মাঠ ছাড়ার আগে সাধারণ মোসল্লিরা স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে মিলে পুরো ময়দানের প্লাস্টিকের বোতল ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে ডাস্টবিনে জমা করেন।

‎চট্টগ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুস কেবল একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা নয়; এটি শান্তি, সম্প্রীতি, পরিচ্ছন্নতা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক জীবন্ত ইশতেহার। এই ভক্তি আর মানবিকতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়—এমনটাই প্রতিধ্বনি আজ চট্টগ্রামজুড়ে।