আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শেষ মুহূর্তে পুলিশি বাধায় পণ্ড হয়ে গেছে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা থাকা একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার। গত ২৯ আগস্ট (শনিবার) সন্ধ্যায় দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) মিলনায়তনে এই আয়োজন হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকেরা। ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন একটি প্রকাশ্য কর্মসূচি ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল।
ঘটনাটি কেবল একটি অনুষ্ঠান বাতিল হওয়া নয়, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে ঢাকা-দিল্লির বর্তমান সম্পর্কের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন।
সেমিনারের আনুষ্ঠানিক বিষয়বস্তু ছিল বেশ তাত্ত্বিক—’ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়ালগ টু আ পার্টনারশিপ’। বেলজিয়ামভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন’ এবং এফসিসি যৌথভাবে এর আয়োজন করে। কিন্তু আলোচনার মূল আকর্ষণ বা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল এর অতিথি তালিকা।
সেমিনারে বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে চরম কোণঠাসা ও নিষিদ্ধ হওয়া দল আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ এবং বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী নূরান নবীর। এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি এবং সাবেক জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজের মতো হাই-প্রোফাইল কূটনীতিকদেরও এখানে অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
সব প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত, ঠিক তখনই আসরে নামে দিল্লি পুলিশ। তিলক মার্গ থানার পক্ষ থেকে আয়োজকদের আবেদনপত্রের ওপর হাতে লিখে জানিয়ে দেওয়া হয়—”কিছু বিতর্কের” কারণে এই অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
পুলিশের নথিতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কার কথা বলা হলেও, দিল্লির কূটনৈতিক পাড়ায় এটি স্পষ্ট যে এই বাধার কারণ ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনার সূত্রপাত মূলত গত ৫ আগস্টের আরেকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই দিন এই এফসিসি-রই একটি অনুষ্ঠানে ভারত থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৫ আগস্টের পর সেটিই ছিল তাঁর প্রথম কোনো দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।
সেদিনের ওই ঘটনাকে বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেয়। ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এমন রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় ঢাকা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং দিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চায়। ভারত তখন এটিকে একটি বেসরকারি ক্লাবের অনুষ্ঠান বলে এড়িয়ে গেলেও, নতুন করে ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে আর কোনো দূরত্ব তৈরি করতে চাইছে না সাউথ ব্লক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সেমিনারটি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ভারত মূলত ঢাকাকে একটি ‘ইতিবাচক বার্তা’ দিতে চেয়েছে। বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর দিল্লির পররাষ্ট্রনীতি এখন ঢাকার নতুন প্রশাসনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ওপর জোর দিচ্ছে। ভারতের মাটিতে বসে আওয়ামী লীগ নেতারা আবার কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা চালালে তা ঢাকার বর্তমান সরকারের সাথে দিল্লির সম্পর্ককে আরও ঝুঁকিতে ফেলত।
তাই তাত্ত্বিক আলোচনার আড়ালে আওয়ামী লীগের এই রাজনৈতিক পুনরুত্থানের চেষ্টাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করেছে দিল্লি পুলিশ। আর এর মধ্য দিয়ে ভারত পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল—আপাতত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের উদ্বেগ ও সেন্টিমেন্টকে তারা বেশ গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করছে।











