ঢাকা ১২:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাসপাতালে মাটিচাপা বিপুল সরকারি ওষুধ, কর্তৃপক্ষ বলছে যক্ষ্মার!

 

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিপুল পরিমাণ সরকারি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী মাটির নিচে পুঁতে আগুন দিয়ে ধ্বংস করার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পেছনে ওষুধের সঠিক হিসাব গোপন ও বার্ষিক অডিট ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে অনিয়ম রয়েছে কি না—তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, এগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ যক্ষ্মার ওষুধ।

তবে গভীর রাতে ১৫ ব্যারেল কেরোসিন ঢেলে এভাবে বিপুল পরিমাণ ওষুধ পোড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এবং সরকারি অডিটে এসব কীভাবে পুড়িয়ে ফেলা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পেছনে থাকা আসল সত্য ও সঠিক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৮ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বার্ষিক অডিট শুরু হয়। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে গভীর রাতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণের একটি নির্জন স্থানে আনুমানিক ৮ ফুট দীর্ঘ ও ৬ ফুট বিস্তৃত গর্ত খনন করা হয়। সেখানে বিপুল পরিমাণ ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ফেলে প্রায় ১৫ ব্যারেল কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে হাসপাতালের প্রধান ফটকের বাম পাশের গ্যারেজ, ড্রাইভারে কোয়ার্টার ও সাবস্টেশন পার হয়ে পানির ট্যাংকের দেয়ালঘেঁষা এলাকায় ওষুধ ধ্বংসের স্থানটি শনাক্ত করা হয়। অনুসন্ধানের সময় ওই স্থানের মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে বিভিন্ন পোড়া ওষুধ, গজ ও ব্যান্ডেজসহ নানা চিকিৎসাসামগ্রীর আলামত। এ ছাড়া হাসপাতালের চতুর্থ তলার গোডাউনেও বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মজুত রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেগুলোও একইভাবে ধ্বংস করা হতে পারে।

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, গত অর্থবছরে সরকারি বরাদ্দের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর বড় একটি অংশ উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে দেওয়া হয়নি। চাহিদার তুলনায় সামান্য ওষুধ সরবরাহ করে বাকি অংশ বাইরে পাচার বা বিক্রির পাঁয়তারা চলছিল। তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় একপর্যায়ে ওষুধগুলোর মেয়াদ পার হয়ে যায়।

পরবর্তীতে নতুন অর্থবছরের অডিট ও দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়ার আগমুহূর্তে হিসাব মেলানোর জন্য তাড়াহুড়ো করে গভীর রাতে এগুলো ধ্বংস করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, অডিট সম্পন্ন হওয়ার পর গত ৬ অক্টোবর নতুন অর্থবছরের ওষুধ কেনার দরপত্র আহ্বান করা হয়, যার জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ১৮ অক্টোবর।

হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তারক্ষী বলেন, ‘ঘটনার বিস্তারিত বলতে পারব না, তবে মাটির নিচে চিকিৎসাসামগ্রী পুঁতে রাখার বিষয়টি সত্যি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. মঈনুল আহসান বলেন, ‘এগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ যক্ষ্মার ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ছিল। প্রতি মাসেই এগুলো নিয়ম অনুযায়ী পোড়ানো হয়।’ মাঠপর্যায়ে ওষুধ বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এটি পুরোপুরি ইউনিয়ন কেন্দ্রগুলোর চাহিদার ওপর নির্ভর করে।

অন্যদিকে, এ বিষয়ে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্যের উৎস জানতে চান এবং বিস্তারিত জানতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ, সিলেট) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম বলেন, ‘ঘটনাটি আমার জানা নেই, সিভিল সার্জন সাহেব হয়তো ভালো বলতে পারবেন।’

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মাটির নিচে ওষুধ পুঁতে রাখার স্থানটি অক্ষত রয়েছে। সচেতন মহলের মতে, দ্রুত প্রশাসনিক অভিযান চালিয়ে মাটি খুঁড়ে আলামত সংগ্রহ এবং হাসপাতালের গোডাউনে থাকা ওষুধের তথ্য পরীক্ষা করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ছাতকের খুরমা উত্তর ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী প্রকৌশলী রজিবুর রহমান মুহেলের গণসংযোগ

হাসপাতালে মাটিচাপা বিপুল সরকারি ওষুধ, কর্তৃপক্ষ বলছে যক্ষ্মার!

আপডেট সময় : ১০:৪১:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

 

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিপুল পরিমাণ সরকারি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী মাটির নিচে পুঁতে আগুন দিয়ে ধ্বংস করার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পেছনে ওষুধের সঠিক হিসাব গোপন ও বার্ষিক অডিট ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে অনিয়ম রয়েছে কি না—তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, এগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ যক্ষ্মার ওষুধ।

তবে গভীর রাতে ১৫ ব্যারেল কেরোসিন ঢেলে এভাবে বিপুল পরিমাণ ওষুধ পোড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এবং সরকারি অডিটে এসব কীভাবে পুড়িয়ে ফেলা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পেছনে থাকা আসল সত্য ও সঠিক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৮ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বার্ষিক অডিট শুরু হয়। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে গভীর রাতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণের একটি নির্জন স্থানে আনুমানিক ৮ ফুট দীর্ঘ ও ৬ ফুট বিস্তৃত গর্ত খনন করা হয়। সেখানে বিপুল পরিমাণ ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ফেলে প্রায় ১৫ ব্যারেল কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে হাসপাতালের প্রধান ফটকের বাম পাশের গ্যারেজ, ড্রাইভারে কোয়ার্টার ও সাবস্টেশন পার হয়ে পানির ট্যাংকের দেয়ালঘেঁষা এলাকায় ওষুধ ধ্বংসের স্থানটি শনাক্ত করা হয়। অনুসন্ধানের সময় ওই স্থানের মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে বিভিন্ন পোড়া ওষুধ, গজ ও ব্যান্ডেজসহ নানা চিকিৎসাসামগ্রীর আলামত। এ ছাড়া হাসপাতালের চতুর্থ তলার গোডাউনেও বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মজুত রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেগুলোও একইভাবে ধ্বংস করা হতে পারে।

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, গত অর্থবছরে সরকারি বরাদ্দের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর বড় একটি অংশ উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে দেওয়া হয়নি। চাহিদার তুলনায় সামান্য ওষুধ সরবরাহ করে বাকি অংশ বাইরে পাচার বা বিক্রির পাঁয়তারা চলছিল। তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় একপর্যায়ে ওষুধগুলোর মেয়াদ পার হয়ে যায়।

পরবর্তীতে নতুন অর্থবছরের অডিট ও দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়ার আগমুহূর্তে হিসাব মেলানোর জন্য তাড়াহুড়ো করে গভীর রাতে এগুলো ধ্বংস করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, অডিট সম্পন্ন হওয়ার পর গত ৬ অক্টোবর নতুন অর্থবছরের ওষুধ কেনার দরপত্র আহ্বান করা হয়, যার জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ১৮ অক্টোবর।

হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তারক্ষী বলেন, ‘ঘটনার বিস্তারিত বলতে পারব না, তবে মাটির নিচে চিকিৎসাসামগ্রী পুঁতে রাখার বিষয়টি সত্যি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. মঈনুল আহসান বলেন, ‘এগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ যক্ষ্মার ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ছিল। প্রতি মাসেই এগুলো নিয়ম অনুযায়ী পোড়ানো হয়।’ মাঠপর্যায়ে ওষুধ বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এটি পুরোপুরি ইউনিয়ন কেন্দ্রগুলোর চাহিদার ওপর নির্ভর করে।

অন্যদিকে, এ বিষয়ে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্যের উৎস জানতে চান এবং বিস্তারিত জানতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ, সিলেট) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম বলেন, ‘ঘটনাটি আমার জানা নেই, সিভিল সার্জন সাহেব হয়তো ভালো বলতে পারবেন।’

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মাটির নিচে ওষুধ পুঁতে রাখার স্থানটি অক্ষত রয়েছে। সচেতন মহলের মতে, দ্রুত প্রশাসনিক অভিযান চালিয়ে মাটি খুঁড়ে আলামত সংগ্রহ এবং হাসপাতালের গোডাউনে থাকা ওষুধের তথ্য পরীক্ষা করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।