ঢাকা ০৪:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় জড়িয়ে কৃষিসমাজের সমৃদ্ধির কামনা

 

আলপনা, ধানের শিষ, লক্ষ্মীর পাঁচালি ও লোকাচারে বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য

 

দুর্গোৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার প্রস্তুতি। ধন-সম্পদ, সৌভাগ্য, অন্ন ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর পুজো বাংলার সনাতন হিন্দু সমাজের অন্যতম প্রধান পারিবারিক উৎসব। শারদীয় পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে পালিত এই পুজো কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো নামে পরিচিত। আজ ২৫ অক্টোবর, রবিবার পালিত হবে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো।

কৃষিজীবনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজের সমৃদ্ধির কামনা। একসময় গোলাভরা ধান, ঘরে পর্যাপ্ত অন্ন এবং ভালো ফসলই ছিল গৃহস্থের সচ্ছলতার প্রধান পরিচয়। তাই দেবী লক্ষ্মীর আরাধনায় ধান, চাল ও শস্যের বিশেষ গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। কৃষকের কাছে লক্ষ্মী শুধু ধনসম্পদের দেবী নন, তিনি অন্ন ও শস্যের প্রাচুর্যেরও প্রতীক।

শাস্ত্রে লক্ষ্মী: ঐশ্বর্য ও মঙ্গলের প্রতীক

হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় দেবী লক্ষ্মী ভগবান বিষ্ণুর সহধর্মিণী এবং ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী। শ্রীসূক্তে শ্রী বা লক্ষ্মীর কাছে প্রাচুর্য, পুষ্টি ও মঙ্গলের প্রার্থনা করা হয়েছে। পুরাণে সমুদ্র মন্থনের সঙ্গে দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাবের কাহিনিও যুক্ত। শাস্ত্রীয় ভাবনায় সমৃদ্ধি শুধু অর্থসম্পদ নয়; অন্ন, পুষ্টি, কল্যাণ ও পারিবারিক সচ্ছলতাও তার অন্তর্ভুক্ত।

‘কোজাগরী’ নামের তাৎপর্য

প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘কোজাগরী’ শব্দটি সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘কে জেগে আছে?’ লোকবিশ্বাস অনুসারে, পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী জগৎ পরিভ্রমণ করেন। সেই বিশ্বাস থেকেই অনেক পরিবারে রাতে জেগে পাঁচালি পাঠ, নামস্মরণ ও দেবীর আরাধনার রীতি রয়েছে। এই আচার ধর্মীয় নিষ্ঠা ও শুভকর্মে সচেতন থাকার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।

আলপনা, চরণচিহ্ন ও লক্ষ্মীর পাঁচালি

লক্ষ্মীপুজোর অন্যতম আকর্ষণ চালের গুঁড়ি দিয়ে আঁকা আলপনা। বাড়ির প্রবেশপথ থেকে পূজাস্থল পর্যন্ত আঁকা হয় দেবীর চরণচিহ্ন, পদ্ম ও শস্যের নকশা। লোকবিশ্বাসে এই চরণচিহ্ন দেবীকে গৃহে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতীক। পুজোর পরে লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ বা শ্রবণ বাংলার পারিবারিক ধর্মাচারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। পাঁচালির কাহিনিতে ভক্তি, গৃহস্থের কর্তব্য ও মঙ্গলের নানা শিক্ষা উঠে আসে।

সরায় লক্ষ্মী, ঘটপুজো ও লোকশিল্পের বৈচিত্র্য

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্মীপুজোর রীতিতে বৈচিত্র্য দেখা যায়। কোথাও মাটির প্রতিমা, কোথাও সরায় আঁকা দেবীর ছবি, কোথাও পট বা মঙ্গলঘটের মাধ্যমে আরাধনা করা হয়। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গীয় ঐতিহ্যে সরায় আঁকা লক্ষ্মীচিত্র লোকশিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। ধানের শিষ, পদ্ম, পেঁচা ও দেবীর মুখের নকশায় ফুটে ওঠে স্থানীয় শিল্পরীতি ও ধর্মীয় ভাবনা।

নাড়ু, মোয়া ও ঘরোয়া ভোগ

নারকেলের নাড়ু, মুড়ির মোয়া, খই, বাতাসা, ফলমূল ও অন্যান্য মিষ্টি বহু পরিবারের লক্ষ্মীপুজোর পরিচিত অনুষঙ্গ। অঞ্চল ও পারিবারিক রীতিভেদে ভোগের ধরন বদলায়। পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে নৈবেদ্য তৈরি, পুজোর আয়োজন এবং প্রসাদ বিতরণের মধ্যে উৎসবের সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

ঐতিহ্যের পাশাপাশি মানবিক বার্তা

লক্ষ্মীপুজো কেবল সম্পদ লাভের প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ নয়। পরিচ্ছন্নতা, পরিশ্রম, সততা, অন্নের মর্যাদা, সঞ্চয় ও দানশীলতার মতো মূল্যবোধের সঙ্গেও এই উৎসবের তাৎপর্য যুক্ত। বাংলার কৃষিসংস্কৃতি, লোকশিল্প, ব্রতকথা ও পারিবারিক পরম্পরা মিলিয়ে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সব মিলিয়ে, শরতের পূর্ণিমায় দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা বাংলার মানুষের কাছে অন্ন, শস্য, শান্তি ও সমৃদ্ধির চিরন্তন প্রার্থনা। প্রদীপের আলো, আলপনার রেখা ও পাঁচালির সুরে এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত সমৃদ্ধি শুধু ধনসম্পদে নয়, পরিবারে শান্তি, পরিশ্রমের মর্যাদা এবং মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যেও নিহিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

চরবংশী ইউনিয়ন গ্রাম আদালত বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় জড়িয়ে কৃষিসমাজের সমৃদ্ধির কামনা

আপডেট সময় : ০২:০২:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

 

আলপনা, ধানের শিষ, লক্ষ্মীর পাঁচালি ও লোকাচারে বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য

 

দুর্গোৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার প্রস্তুতি। ধন-সম্পদ, সৌভাগ্য, অন্ন ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর পুজো বাংলার সনাতন হিন্দু সমাজের অন্যতম প্রধান পারিবারিক উৎসব। শারদীয় পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে পালিত এই পুজো কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো নামে পরিচিত। আজ ২৫ অক্টোবর, রবিবার পালিত হবে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো।

কৃষিজীবনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজের সমৃদ্ধির কামনা। একসময় গোলাভরা ধান, ঘরে পর্যাপ্ত অন্ন এবং ভালো ফসলই ছিল গৃহস্থের সচ্ছলতার প্রধান পরিচয়। তাই দেবী লক্ষ্মীর আরাধনায় ধান, চাল ও শস্যের বিশেষ গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। কৃষকের কাছে লক্ষ্মী শুধু ধনসম্পদের দেবী নন, তিনি অন্ন ও শস্যের প্রাচুর্যেরও প্রতীক।

শাস্ত্রে লক্ষ্মী: ঐশ্বর্য ও মঙ্গলের প্রতীক

হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় দেবী লক্ষ্মী ভগবান বিষ্ণুর সহধর্মিণী এবং ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী। শ্রীসূক্তে শ্রী বা লক্ষ্মীর কাছে প্রাচুর্য, পুষ্টি ও মঙ্গলের প্রার্থনা করা হয়েছে। পুরাণে সমুদ্র মন্থনের সঙ্গে দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাবের কাহিনিও যুক্ত। শাস্ত্রীয় ভাবনায় সমৃদ্ধি শুধু অর্থসম্পদ নয়; অন্ন, পুষ্টি, কল্যাণ ও পারিবারিক সচ্ছলতাও তার অন্তর্ভুক্ত।

‘কোজাগরী’ নামের তাৎপর্য

প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘কোজাগরী’ শব্দটি সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘কে জেগে আছে?’ লোকবিশ্বাস অনুসারে, পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী জগৎ পরিভ্রমণ করেন। সেই বিশ্বাস থেকেই অনেক পরিবারে রাতে জেগে পাঁচালি পাঠ, নামস্মরণ ও দেবীর আরাধনার রীতি রয়েছে। এই আচার ধর্মীয় নিষ্ঠা ও শুভকর্মে সচেতন থাকার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।

আলপনা, চরণচিহ্ন ও লক্ষ্মীর পাঁচালি

লক্ষ্মীপুজোর অন্যতম আকর্ষণ চালের গুঁড়ি দিয়ে আঁকা আলপনা। বাড়ির প্রবেশপথ থেকে পূজাস্থল পর্যন্ত আঁকা হয় দেবীর চরণচিহ্ন, পদ্ম ও শস্যের নকশা। লোকবিশ্বাসে এই চরণচিহ্ন দেবীকে গৃহে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতীক। পুজোর পরে লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ বা শ্রবণ বাংলার পারিবারিক ধর্মাচারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। পাঁচালির কাহিনিতে ভক্তি, গৃহস্থের কর্তব্য ও মঙ্গলের নানা শিক্ষা উঠে আসে।

সরায় লক্ষ্মী, ঘটপুজো ও লোকশিল্পের বৈচিত্র্য

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্মীপুজোর রীতিতে বৈচিত্র্য দেখা যায়। কোথাও মাটির প্রতিমা, কোথাও সরায় আঁকা দেবীর ছবি, কোথাও পট বা মঙ্গলঘটের মাধ্যমে আরাধনা করা হয়। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গীয় ঐতিহ্যে সরায় আঁকা লক্ষ্মীচিত্র লোকশিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। ধানের শিষ, পদ্ম, পেঁচা ও দেবীর মুখের নকশায় ফুটে ওঠে স্থানীয় শিল্পরীতি ও ধর্মীয় ভাবনা।

নাড়ু, মোয়া ও ঘরোয়া ভোগ

নারকেলের নাড়ু, মুড়ির মোয়া, খই, বাতাসা, ফলমূল ও অন্যান্য মিষ্টি বহু পরিবারের লক্ষ্মীপুজোর পরিচিত অনুষঙ্গ। অঞ্চল ও পারিবারিক রীতিভেদে ভোগের ধরন বদলায়। পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে নৈবেদ্য তৈরি, পুজোর আয়োজন এবং প্রসাদ বিতরণের মধ্যে উৎসবের সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

ঐতিহ্যের পাশাপাশি মানবিক বার্তা

লক্ষ্মীপুজো কেবল সম্পদ লাভের প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ নয়। পরিচ্ছন্নতা, পরিশ্রম, সততা, অন্নের মর্যাদা, সঞ্চয় ও দানশীলতার মতো মূল্যবোধের সঙ্গেও এই উৎসবের তাৎপর্য যুক্ত। বাংলার কৃষিসংস্কৃতি, লোকশিল্প, ব্রতকথা ও পারিবারিক পরম্পরা মিলিয়ে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সব মিলিয়ে, শরতের পূর্ণিমায় দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা বাংলার মানুষের কাছে অন্ন, শস্য, শান্তি ও সমৃদ্ধির চিরন্তন প্রার্থনা। প্রদীপের আলো, আলপনার রেখা ও পাঁচালির সুরে এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত সমৃদ্ধি শুধু ধনসম্পদে নয়, পরিবারে শান্তি, পরিশ্রমের মর্যাদা এবং মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যেও নিহিত।