বিশেষ প্রতিবেদক :
দেশে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিংয়ে যখন সাধারণ মানুষের জনজীবন ও শিল্পোৎপাদন ওষ্ঠাগত, তখন জাতীয় গ্রিডের ওপর নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতির এই মরণকালে বিলাসবহুল ই-কার ও অবৈধ থ্রি-হুইলারের চার্জিংয়ের পেছনে মেগাওয়াটের পর মেগাওয়াট বিদ্যুতের অপচয় যেন ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের অলিগলিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। এক একটি রিকশা চার্জ করতে দৈনিক ৫ থেকে ৬ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। দেশের বিশাল সংখ্যক এই বাহনগুলোর সিংহভাগই চার্জ হচ্ছে রাতে, সরাসরি মেইন লাইন থেকে হুকিং বা অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে। এর ফলে সরকার একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সিস্টেম লস ও গ্রিড বিপর্যয়ের ঝুঁকি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে আমদানিকৃত আধুনিক ইলেকট্রিক গাড়ি (ই-কার), যা চার্জ করতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে টেনে নেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন ফ্যান-লাইট চালানোর বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, তখন এই ধরণের বিলাসিতা সাধারণ গ্রাহকদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
আমাদের পাশের দেশ ভারত নিজেদের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও বিদ্যুতের সক্ষমতার কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত দূরদর্শী ও কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। তারা জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে চীন থেকে আমদানিকৃত লাখ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ি ফেরত দিতে বা চুক্তি বাতিল করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। অথচ আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা এই চরম সংকটের মাঝেও এক অদ্ভুত নীরবতা পালন করছেন। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কোনো কার্যকর রোডম্যাপ বা দূরদর্শী পরিকল্পনা ছাড়াই দেশে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ির অনুমোদন ও রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হচ্ছে, যা বর্তমান বাস্তবতায় চরম আত্মঘাতী।
দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভারতের মতো সাময়িকভাবে সব ধরণের বিলাসবহুল ই-কার আমদানি ও এর নিবন্ধন সম্পূর্ণ স্থগিত করা উচিত।সারাদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার যে হাজার হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশন বা গ্যারেজ গড়ে উঠেছে, সেগুলোতে অবিলম্বে যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম বা টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। যদি অপরিহার্য ক্ষেত্রে চার্জ দিতেই হয়, তবে তা গভীর রাতে (রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা) অফ-পিক আওয়ারে করার কঠোর নিয়ম এবং প্রি-পেইড স্মার্ট মিটারের আওতায় আনা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার অবশ্যই প্রশংসনীয়, তবে তা দেশের মৌলিক অবকাঠামো ও সক্ষমতাকে ধ্বংস করে নয়। যেখানে দেশের কলকারখানা বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম, সেখানে বিলাসবহুল ই-কার এবং অবৈধ রিকশার পেছনে বিদ্যুৎ অপচয় কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। সরকারকে এখনই এই নীরবতা ভেঙে ভারতের মতো কঠোর ও জাতীয় স্বার্থবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে হবে; অন্যথায় দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে মরার উপর খাঁড়ার ঘা: ই-কার লাগাম টানবে কে?
জনপ্রিয় সংবাদ
















