আজ ৮ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। প্রতিবছর বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবসে ফিজিওথেরাপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলেও ২০২৬ সালের দিবসের মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধ এবং পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপির ভূমিকার ওপর।
কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদ্রোগ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ মানুষ হৃদ্রোগজনিত কারণে মারা যায়। এসব মৃত্যুর বড় একটি অংশ হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর বোঝা তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে ওষুধ ও চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এখানেই ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশনে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা
হার্ট অ্যাটাক, হার্ট সার্জারি বা অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার পর রোগীর শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বাসন পদ্ধতি। ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে রোগীর শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়াম, শারীরিক কার্যক্রম, সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
নিয়ন্ত্রিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালিত ব্যায়াম রোগীর functional capacity বাড়াতে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা কমাতে এবং ভবিষ্যৎ কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
স্ট্রোক পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি
স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যায়। পাশাপাশি হাঁটা, ভারসাম্য, হাতের কার্যক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাও ব্যাহত হতে পারে।
নিউরোলজিক্যাল ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে রোগীর মাসল স্ট্রেংথ, ব্যালান্স, কো-অর্ডিনেশন, গেইট এবং functional mobility উন্নত করার জন্য বিভিন্ন প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এর লক্ষ্য শুধু রোগীর নড়াচড়া ফিরিয়ে দেওয়া নয়; বরং তাকে যতটা সম্ভব স্বাধীন ও স্বনির্ভর জীবনে ফিরিয়ে নেওয়া।
ফিজিওথেরাপি শুধু ব্যথার চিকিৎসা নয়
সমাজে এখনও অনেকের ধারণা, ফিজিওথেরাপি মানেই ম্যাসাজ, হিট বা ব্যথা কমানোর চিকিৎসা। কিন্তু আধুনিক ফিজিওথেরাপি একটি বিস্তৃত স্বাস্থ্যবিজ্ঞানভিত্তিক পেশা।
এর মধ্যে রয়েছে—
Cardiopulmonary Physiotherapy — হৃদ্রোগ ও শ্বাসতন্ত্রের রোগীদের পুনর্বাসন
Neurological Physiotherapy — স্ট্রোক, পারকিনসনস, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি ইত্যাদিতে পুনর্বাসন
Orthopaedic Physiotherapy — হাড়, জয়েন্ট, পেশি ও মেরুদণ্ডের সমস্যায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
Paediatric Physiotherapy — শিশুদের বিভিন্ন শারীরিক ও বিকাশগত সমস্যায় পুনর্বাসন
Geriatric Physiotherapy — বয়স্কদের শক্তি, ভারসাম্য ও চলনক্ষমতা বজায় রাখা
Sports Physiotherapy — খেলোয়াড়দের ইনজুরি প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ফিজিওথেরাপি
ফিজিওথেরাপির ভূমিকা শুধু রোগ হওয়ার পর শুরু হয় না। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, বসে থাকার সময় কমানো এবং সক্রিয় জীবনযাপনের মাধ্যমে হৃদ্রোগ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতেও ফিজিওথেরাপিস্টরা ভূমিকা রাখতে পারেন।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ফিজিওথেরাপি সব রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের বিকল্প নয়। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্টসহ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যপেশাজীবীদের সমন্বিত চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন আরও বেশি
বাংলাদেশে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের বোঝা বাড়ছে। এর ফলে রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
গ্রাম থেকে শহর—সব পর্যায়ে সহজলভ্য ও মানসম্মত ফিজিওথেরাপি এবং পুনর্বাসনসেবা নিশ্চিত করা গেলে স্ট্রোক ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষকে পুনরায় কর্মক্ষম ও স্বনির্ভর জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস ২০২৬ তাই শুধু ফিজিওথেরাপিস্টদের একটি বিশেষ দিন নয়; এটি মানুষের মধ্যে শারীরিক সক্রিয়তা, হৃদ্স্বাস্থ্য, স্ট্রোক প্রতিরোধ এবং পুনর্বাসন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
সুস্থ হৃদ্যন্ত্রের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক পুনর্বাসন। আর সেই পথচলায় ফিজিওথেরাপি হতে পারে স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
“ব্যথামুক্ত জীবনের পাশাপাশি—সচল, স্বনির্ভর ও সুস্থ জীবন গড়াই হোক ফিজিওথেরাপির অঙ্গীকার।”
যবিপ্রবি প্রতিনিধি : জাহিদ হাসান 



















