রাসেল চৌধুরী :
দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও ভূপ্রকৃতির অন্যতম রক্ষাকবচ চট্টগ্রামের পাহাড়। কিন্তু সেই পাহাড়গুলোই এখন এক শ্রেণির ভূমিগ্রাসী ও অসৎ চক্রের তীব্র লালসার শিকার। সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে এবং প্রশাসনের হাত থেকে বাঁচতে এবার তারা বেছে নিয়েছে এক চতুর ও অভিনব কৌশল—রাজনৈতিক কর্মসূচির ব্যানার। একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের বিশাল ব্যানার সামনে ঝুলিয়ে, তার আড়ালে এক বিশাল পাহাড় কেটে সাবাড় করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল চট্টগ্রাম নগরীতে।
তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রতিরোধ এবং চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানের কঠোর ও আপসহীন হস্তক্ষেপে এই ভয়াবহ পরিবেশবিধ্বংসী চক্রান্ত নস্যাৎ করা হয়েছে। এমপির তাৎক্ষণিক নির্দেশে খুলশী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে দ্রুত অভিযান চালিয়ে জড়িতদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনেছে। তবে এই ঘটনাটি চট্টগ্রামের পাহাড় ব্যবস্থাপনার একটি অন্ধকার দিক এবং মাঠপর্যায়ের তদারকির দায়িত্বে থাকা পরিবেশ অধিদপ্তরের চরম ব্যর্থতাকে আবারও জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
ব্যানারের আড়ালে ‘গুপ্ত অপরাধ’: যেভাবে সাজানো হয়েছিল ছক
অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর খুলশী থানাধীন একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধচক্রটি এই নীল নকশা সাজায়। দিনের আলোতে সেখানে যেন কেউ সন্দেহ না করে, সেজন্য পাহাড়ের ঠিক প্রবেশমুখ এবং কাটার মূল অংশটি ঢেকে দেওয়া হয় বিশাল আকৃতির রাজনৈতিক ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে। দূর থেকে দেখলে যে কারও মনে হবে, সেখানে কোনো দলীয় কর্মসূচির প্রস্তুতি চলছে বা রাজনৈতিক কার্যালয় স্থাপন করা হচ্ছে।
কিন্তু এই রাজনৈতিক আবরণের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক চরম প্রকৃতি ধ্বংসের মহোৎসব। ব্যানার দিয়ে আড়াল তৈরি করে ভেতরের অংশে শ্রমিক এবং মাটি কাটার ভারী যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। স্থানীয় সিন্ডিকেটের পরিকল্পনা ছিল, দিনের বেলায় রাজনৈতিক ব্যানারের সুরক্ষায় পাহাড়ের ভেতরের অংশ কাটা হবে এবং রাতের আঁধারে শত শত ট্রাকে করে সেই মাটি চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় পাচার করা হবে।
সংসদ সদস্যের ‘জিরো টলারেন্স’ ও আপসহীন ভূমিকা
রাজনৈতিক কর্মসূচির নাম ভাঙিয়ে এই ধরনের জঘন্য অপরাধের খবরটি পাওয়ার সাথে সাথেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। তিনি কোনো প্রকার রাজনৈতিক সমীকরণ বা প্রভাবের তোয়াক্কা না করে অবিলম্বে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এ বিষয়ে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন:
”রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য, প্রকৃতি ধ্বংসের জন্য নয়। কোনো দল, নেতা বা কর্মসূচির নাম ব্যবহার করে যারা চট্টগ্রামের ফুসফুস এই পাহাড় কাটতে চায়, তারা আর যাই হোক কোনো রাজনৈতিক কর্মী হতে পারে না; তারা স্পষ্টতই অপরাধী। আমি প্রশাসনকে পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছি—অপরাধীর কোনো দল নেই। পাহাড় ও পরিবেশ রক্ষায় আমরা শতভাগ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখব এবং জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
এমপির এই কঠোর ও অনড় অবস্থানের পর খুলশী থানা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের একটি যৌথ দল দ্রুত অভিযানে নামে। তারা ব্যানার সরিয়ে ভেতরে পাহাড় কাটার প্রাথমিক ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ পায় এবং পাহাড় কাটার মূল হোতাসহ শ্রমিকদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়।
স্থানীয়দের বিস্ফোরক অভিযোগ: “পরিবেশ অধিদপ্তর শুধু ঠুঁটো জগন্নাথ”
এমপির দ্রুত পদক্ষেপ এবং খুলশী থানা পুলিশের তাৎক্ষণিক অ্যাকশনের কারণে এই পাহাড়টি এক নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে গেলেও, মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ‘পরিবেশ অধিদপ্তর’-এর ওপর স্থানীয় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন আকাশচুম্বী। পাহাড় কাটা বন্ধের মূল দায়িত্ব যাদের, সেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তাকেই এই অভিযানের আগে বা পরে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একাধিক প্রবীণ বাসিন্দা জানান:
টানা উপেক্ষিত অভিযোগ: পাহাড়ের আশেপাশে সন্দেহজনক নড়াচড়া দেখে স্থানীয়রা একাধিকবার পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ফোন করে জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই “দেখছি” বা “জনবল সংকট” বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের এক শীর্ষ গবেষক এই প্রতিবেদকের মুখোমুখি হয়ে বলেন, “সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান সাহেব যা করেছেন, তা দৃষ্টান্তমূলক। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সদিচ্ছা থাকলে রাজনৈতিক অপব্যবহার রোখা সম্ভব। একই সাথে খুলশী থানা পুলিশ যেভাবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে তা প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন এমপি বা পুলিশ কি প্রতিদিন পাহাড় পাহারা দেবেন? এটা তো একটা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সেন্ট টিম কেন নিয়মিত পাহাড়ে টহল দেয় না? কেন তাদের গোয়েন্দা নজরদারি নেই? এই চুরির দায় পরিবেশ অধিদপ্তর কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।”
আইনের কঠিন ফেরে অপরাধীরা, দাবি চিরস্থায়ী সমাধানের
খুলশী থানা পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে, আটককৃতদের বিরুদ্ধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অত্যন্ত কঠোর মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সাথে এই চক্রের পেছনে নেপথ্যে থেকে কারা অর্থায়ন করছিল এবং কার প্রশ্রয়ে তারা খুলশী এলাকার পাহাড়ে হাত দেওয়ার মতো এত বড় সাহস পেয়েছে, তা উদ্ঘাটনে পুলিশি তদন্ত চলছে।
চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করে, পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হলে শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান বা অপরাধী ধরা যথেষ্ট নয়। যতক্ষণ না তদারকিতে ব্যর্থ পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং পাহাড়ের ডিজিটাল ম্যাপিং করে ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি বা ড্রোন নজরদারি চালু করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভূমিদস্যুদের এই অভিনব ও চতুর কৌশলগুলো থামানো যাবে না।
আজ খুলশীতে ব্যানার সরলেও, কাল হয়তো অন্য কোনো ছদ্মবেশে আবার আঘাত হানা হবে চট্টগ্রামের প্রকৃতির বুকে—এই আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চট্টগ্রামের পরিবেশপ্রেমীদের মনে।
রাজনৈতিক ব্যানারে পাহাড় কাটার মহোৎসব: এমপির অ্যাকশনে রক্ষা, ঘুমিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর
জনপ্রিয় সংবাদ
















