বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যারা দিন-রাত এক করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন, সেই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জীবনের ভেতরের গল্পটা মোটেও মসৃণ নয়। বাইরে থেকে প্রবাসীদের জীবন যতটা ঝকঝকে দেখায়, ভেতরে তা এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর বঞ্চনায় ভরা। ‘সোনার হরিণ’ ধরার আশায় বুক বেঁধে বিদেশে গিয়ে কীভাবে একজন প্রবাসী ধুঁকে ধুঁকে নিজের সোনালী সময় বিসর্জন দেন, সেইসব তিক্ত ও নির্মম অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন একসময়ের মাঠপর্যায়ের রেমিট্যান্স যোদ্ধা ইব্রাহীম খলিল সুজন।
নিজের প্রবাস জীবনের সেইসব দিনগুলোর কথা মনে করে ইব্রাহীম খলিল সুজন জানান, একজন মানুষ যখন দেশ ছাড়েন, তখন তিনি কেবল একা যান না; সাথে নিয়ে যান পরিবারের এক আকাশ স্বপ্ন ও ঋণের বোঝা। কিন্তু বিদেশে পা রাখার পর থেকেই শুরু হয় এক কঠিন মানসিক ও শারীরিক যুদ্ধ। প্রবাস যাত্রার শুরুটাই হয় এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়ে। দেশে থাকতে দালালরা যে কাজের কথা বলে, যে বেতনের লোভ দেখায়—বিদেশে নামার পর তার সিংহভাগেরই কোনো মিল পাওয়া যায় না। এসি রুমে বা আরামদায়ক কাজের কথা বলে অনেককেই নামিয়ে দেওয়া হয় মরুভূমির তপ্ত বালুতে কিংবা কনকনে শীতের মাঝে কনস্ট্রাকশনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। প্রথম কয়েক মাস আকামা (বৈধ কাজের অনুমতিপত্র) না পেয়ে অনেক প্রবাসীকেই ফেরারী আসামির মতো পুলিশ আর প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়, যা একজন মানুষের আত্মসম্মানকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।
বিদেশের মাটিতে প্রবাসীদের থাকার জায়গার বর্ণনা দিতে গিয়ে সুজন জানান, একটি ছোট রুমে গাদাগাদি করে ১০ থেকে ১২ জন মানুষকে থাকতে হয়। যেখানে না থাকে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ, না থাকে ভালো মানের খাবার। দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রম করার পর, নিজের কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে রান্না—সবকিছুই করতে হয় ক্লান্ত শরীরে। অসুস্থ হলেও ছুটি মেলে না অনেক সময়। এত ত্যাগের পরও কর্মক্ষেত্রে বা স্থানীয় নাগরিকদের কাছ থেকে অনেক সময়ই মেলে না ন্যূনতম মানবিক আচরণ।
ইব্রাহীম খলিল সুজনের মতে, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে মানসিকভাবে এবং সেটি আসে আপনজনদের কাছ থেকেই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যতদিন মাস শেষে পকেটে টাকা থাকে এবং তা দেশে পাঠানো যায়, ততদিন প্রবাসীরা সবার কাছে খুব প্রিয়। কিন্তু কোনো মাসে টাকা পাঠাতে একটু দেরি হলে কিংবা আকামার পেছনে বড় অঙ্কের খরচ হয়ে গেলে, দেশের চেনা মানুষগুলোর সুর বদলে যায়। সবাই শুধু টাকার হিসাব বোঝে, কিন্তু এই টাকাটা উপার্জন করতে গিয়ে প্রবাসীর শরীর থেকে কতটা রক্ত পানি হয়েছে, সেই খবর নেওয়ার মানসিকতা খুব কম মানুষেরই থাকে। এমনকি বছরের পর বছর প্রবাসে থেকে যখন একজন মানুষ শূন্য হাতে কিংবা ভাঙা শরীর নিয়ে দেশে ফিরে আসেন, তখন সমাজও তাকে আর আগের মতো মূল্যায়ন করে না। তখন সে হয়ে যায় নিজের পরিবারের কাছেই এক প্রকার বোঝা।
সাবেক এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন দপ্তরে প্রবাসীদের ‘হয়রানি’ যেন এক নিত্যদিনের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে প্রবাসীদের পাঠানো ডলারে দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী হয়, তারা যখন দেশে ফেরেন বা বিদেশে যান, তখন বিমানবন্দরে তাদের সাথে অপরাধীদের মতো আচরণ করা হয়, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
ইব্রাহীম খলিল সুজন প্রবাসীদের সুরক্ষায় সরকারের নীতিগত পরিবর্তন ও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়ে বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা, বিদেশে কর্মক্ষেত্রে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রবাসফেরত মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই নীরব কান্না আর দীর্ঘশ্বাস দেশের অর্থনীতির ওপর একদিন বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
















