অফিসে ছিলেন না, কিন্তু হাজিরা খাতায় আগেই স্বাক্ষর। ভূমি অফিসে প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে ধরা পড়া এই ঘটনায় এবার বদলি করা হলো দুই এসিল্যান্ডকে।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবযানী কর ও অংমাচিং মারমাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। দেবযানী করকে খুলনায় এবং অংমাচিং মারমাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার শুরু ৩১ আগস্ট সকালে। কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই নারায়ণগঞ্জের খানপুর এলাকায় সদর, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের ভূমি কার্যালয়ে যান ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। সকাল ৯টার পরও সেখানে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন না। অথচ হাজিরা খাতা খুলে দেখা যায়, অনুপস্থিত কয়েকজনের স্বাক্ষর আগেই দেওয়া রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর চোখে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে হাজিরা খাতার এই অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর। তিনি ঘটনাটিকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরিদর্শনের সময় ভূমি সেবা কার্যক্রম নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
এরপর দুই এসিল্যান্ডসহ মোট ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে বলা হয়, অনুপস্থিত থেকেও হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষর করা সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, ২০১৮ এবং সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯-এর লঙ্ঘন। সংশ্লিষ্টদের তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছিল।
অবশ্য বিষয়টি শুধু দুই এসিল্যান্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সদর, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ সার্কেলের আরও ১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও শোকজ করা হয়েছে। তারা লিখিতভাবে নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসন একই সঙ্গে তিন বছরের বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকাও করছে। তাদের ক্ষেত্রেও পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
এই ঘটনাটি আসলে শুধু দুই কর্মকর্তার বদলির গল্প নয়। প্রশ্নটা আরও বড়। সরকারি অফিসে একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি শুধু হাজিরা খাতার একটি স্বাক্ষর দিয়ে প্রমাণ করার বিষয় নয়। কারণ ওই অফিসে প্রতিদিন ভূমি, নামজারি, খাজনা, সনদসহ নানা সেবা নিতে সাধারণ মানুষ আসেন। কর্মকর্তা যদি অফিসে না থাকেন, তাহলে তার অনুপস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন সেই নাগরিকই।
আর হাজিরা খাতায় আগে স্বাক্ষর করে রাখা সত্য হলে সেটি আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ সরকারি চাকরিতে উপস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, এটি জনগণের প্রতি দায়িত্বও।
আকস্মিক পরিদর্শনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই। নিয়মিত তদারকি থাকলে অনেক অনিয়ম শুরু হওয়ার আগেই থামানো সম্ভব। আর জবাবদিহি যদি শুধু কোনো মন্ত্রী হঠাৎ অফিসে গেলে শুরু হয়, তাহলে সেটিও প্রশাসনের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
সরকারি অফিসে চেয়ার আছে, হাজিরা খাতা আছে, স্বাক্ষরও আছে। এখন নিশ্চিত করতে হবে, সেই চেয়ারে দায়িত্বশীল মানুষটিও সময়মতো আছেন কি না।
হারুন রশিদ শেখ স্টাফ রিপোর্টার 


















