কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তার ভাঙন রোধে শুধু জিও ব্যাগ দিয়ে ঠেকানো যাচ্ছেনা নদীর পাড়। তবে নদীর নীচ থেকে উপরে পাড় পর্যন্ত জিও ব্যাগ দিয়ে পাইলিং করে দিলে কিছুটা ভাঙন রোধ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। যে সকল এলাকায় জিও ব্যাগ দিয়ে পাইলিং করে দেয়া হয়েছে সে সকল এলাকায় ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে ওই এলাকার পাড়ের মানুষ।
শুধু পাড়ে জিও ব্যাগ ফেলিয়ে ভাঙন রোধে করা সম্ভব নয় জানান তিস্তা পাড়ের মানুষজন। এতে করে তিস্তার ভাঙনের কবলে পরে প্রতি বছর শত শত পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। উপায় না পেয়ে তারা খোলা আকাশের নীচে কিংবা অন্যের জমিতে বসবাস করে আসছেন। এসকল এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা পুনর্বাসন সহ ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধান চান।
জানা যায়, উপজেলায় ১টি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪টি ইউনিয়ন দলদলিয়া, থেতরাই, গুনাইগাছ ও বজরা তিস্তা নদী দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে। এসকল ইউনিয়নে প্রতি বছর তীরের পাড় এবং ভেসে উঠা চরাঞ্চলের শতশত মানুষের বসতভিটা ও একরময় একর জমি তিস্তা গর্ভে বিলীনে নিঃস্ব হচ্ছে। এসব ইউনিয়নে তিস্তা নদীর ভাঙন কবলিত এলাকার মধ্যে চাপরারপাড় হাজিপাড়া, উচ্চগ্রাম, বসনিয়াপাড়া, মুন্সিপাড়া, কর্পূরা, ঠুটাপাইকার, গোড়াইপিয়ার, শেখেরটেক, পাকার মাথা, দড়ি কিশোর পুর, বামনপাড়া, লাল মসজিদ, কুমারপাড়া, ভেন্ডারপাড়া, ফকিরপাড়া, মাঝিপাড়া, পশ্চিম বজরা, চর বজরা, বাঁধের মাথা, উত্তর সাদুয়া দামার হাট, খামার দামারহাট নদীর পশ্চিমপাড়, সাতালস্ক, চর বজরা, সন্তোষ অভিরাম, কাজিরচক সহ অন্যান্য এলাকা ভাঙন হিসাবে চিহ্নিত করে সরকারি ভাবে জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর কাজ করলেও অনেক এলাকায় এখনো ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
এসব এলাকায় নতুন করে নদী ভাঙনে একরের পর একর আবাদি জমি, বসতবাড়ি এবং বড় বড় গাছ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিন তিস্তার ভাঙন কবলিত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন রোধের চেষ্টা করলেও তা কোন কাজে আসছে না। পাড়ে জিও ব্যাগ দিয়ে পাইলিং করে না দেওয়ায় তীব্র স্রোতে ব্যাগের নিচের মাটি সরে গিয়ে জিও ব্যাগ স্থান্তরিত হচ্ছে। ফলে পাড় ভেঙে জিও ব্যাগ সহ নদী গর্ভে চলে যাচ্ছে। এতে করে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে পাড়ের মানুষজন। এছাড়া যে সকল এলাকায় জিও ব্যাগ দিয়ে পাইলিং করে দেয়া হয়েছে সে সকল এলাকায় ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে ওই এলাকার পাড়ের মানুষজন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ জীবন বাঁচার তাগিদে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছেন। সন্তানের লেখাপড়ায় নেমে আসে অনিশ্চিয়তা সে সময় আত্মীয়স্বজনের কাছে আশ্রয় নেওয়া, আদি কিংবা অর্থের বিনিময়ে কন্ট্রাক করে জমি নিয়ে থাকা, কিংবা নতুন জেগে ওঠা চরে বসতি গড়া, কোনো দেওয়ানির অধীনে কোথাও ঠাঁই নিতে হয়। এসময় পুনর্বাসনের পথও অনেকাংশে ভুক্তভোগীকেই খুঁজে নিতে হয়। তাই চরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা পুনর্বাসন সহ ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধান চান।
উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের তিস্তা নদী বেষ্টিত গোড়াইপিয়ার এলাকার নুরুজ্জামান মিয়া (৮০) জানান, এক একর জমি চারবার তিস্তার ভাঙনের কবলে পড়ে যায়। সর্বশেষ ১০ শতক জমি অবশিষ্ট থাকে। তা রক্ষার জন্য গত বছর আমার নিজের অর্থায়নে ৬ হাজার বালু ভর্তি বস্তা দিয়ে ভাঙন রোধের চেষ্টা করেছিলাম। এবছর তিস্তা করাল গ্রাসে সব বস্তা নিয়ে যায়। সে সাথে আমার বাড়ির ৮ শতক জমি তিস্তা নিয়ে যায়। অবশিষ্ট রয়েছে ২ শতক জমি। তা রক্ষার জন্য অনেক চেয়ারম্যান দোয়া প্রার্থী প্রতিনিধির নিকট অনুরোধ করেছি। কেউ এগিয়ে আসেনি। সবশেষে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল ইসলাম বাদল আমার পাশে দাঁড়ায়। কিছু জিও ব্যাগ এলে তা এমনিতেই পাড়ে ফেলে দেয়। যা একটু তীব্র স্রোতে চলে যাওয়ার পথে। তিনি দাবি করে বলেন, আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু রক্ষায় জিও ব্যাগ দিয়ে পাইলিং করে দিবেন। আমি ঘরের এক কোণে সামান্য একটু চা পানের দোকান
বসে দু’চার টাকা আয় করে কোন রকম জীবীকা নির্বাহ করি।
দলদলিয়া ইউনিয়নের চাপরার পাড় হাজী পাড়া এলাকার মাজু মিয়া বলেন, গত দু’দিন আগে তিস্তা আমার বাড়ি ভেঙে নিয়ে যায়। উপায় না পেয়ে অন্যের জমিতে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে অনেক কষ্ট করে আছি। বাড়িভিটা বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। আমি নিরুপায় অসহায়।
থেতরাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল ইসলাম বাদল জানান, তিস্তা নদী বেষ্টিত থেতরাই ইউনিয়ন। যেখানে প্রতি বছর নদী ভাঙনের ফলে শত শত পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। যারা জনপ্রতিনিধি হবে তাদের উচিৎ এ সকল অসহায় মানুষের পাশে থাকা। সে লক্ষ্যে আমি ভাঙন কবলিত এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তিস্তার ভাঙনের বিষয় অবগত আছি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিও ব্যাগ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ভাঙনরোধে কাজও চলমান রয়েছে। ভাঙনরোধ ঠেকাতে আরও জিও ব্যাগের প্রয়োজন হলে তা সরবরাহ করা হবে বলে জানান তিনি।
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ,টি,এম আরিফ জানান, তিস্তা নদী ভাঙন এলাকাগুলোতে জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন রোধে কাজ চলমান রয়েছে। ভাঙনে যারা বাস্তহারা হচ্ছে তাদের আবেদনের ভিত্তিতে সরকারি খাস জমিতে তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে পুনর্বাসন করে দেয়া হবে। এছাড়া ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষজনের জন্য শুকনো খাবার ও চাল বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
মোঃ রেজাউল ইসলাম স্টাফ রিপোর্টার 


















