রূপগঞ্জ উপজেলার ব্যস্ততম এলাকা ভুলতা ফ্লাইওভারের নিচে চলছে ব্যতিক্রমী এক মানবিক উদ্যোগ। যেখানে সপ্তাহে তিন দিন বিনামূল্যে খাবার পাচ্ছেন অসহায়, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় ২০০শতাধিক মানুষ।
সাড়ে তিন বছর ধরে শাহবাজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে ‘মানবতার দস্তরখানা’ নামের এই কার্যক্রম। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে একবেলা খাবার তুলে দিয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন সংগঠনটির সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবীরা।
ব্যস্ততম ভুলতা ফ্লাইওভারের নিচে খাবারের অপেক্ষায় ভিড় করছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কেউ রিকশাচালক, কেউ বাসের হেলপার, কেউ দিনমজুর, আবার কেউ ভিক্ষুক কিংবা অসহায় পথচারী। এখানে নেই ধনী-গরিবের ভেদাভেদ।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে বসে খাচ্ছেন বিনামূল্যের খাবার। খাবার পেয়ে অনেকের মুখেই ফুটে উঠছে তৃপ্তির হাসি।
জানা যায়, প্রতি সপ্তাহের শনিবার, সোমবার ও বুধবার ভুলতা ফ্লাইওভারের নিচে বসে এই মানবতার দস্তরখানা। প্রতিদিন প্রায় ২০০ শতাধিক মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন করে শাহবাজ ফাউন্ডেশন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, রিকশাচালক, শ্রমজীবী ও অসহায় ব্যক্তিরা এই উদ্যোগের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে, সেখানে সপ্তাহে তিন দিন বিনামূল্যে একবেলা খাবার পাওয়া তাঁদের জন্য বড় স্বস্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাবার খেতে আসা অটোচালক শাহালম জানান, ‘সারা দিন রিকশা চালিয়ে যা আয় করি, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। অনেক সময় নিজের খাবারের টাকা বাঁচিয়ে পরিবারের জন্য নিয়ে যেতে হয়। এখানে সপ্তাহে তিন দিন বিনামূল্যে পেট ভরে খাবার খেতে পারি। এতে আমাদের মতো গরিব মানুষের অনেক উপকার হয়। যাঁরা এই খাবারের ব্যবস্থা করেছেন, আল্লাহ তাঁদের ভালো রাখুন।’
বাসের হেলপার সিয়াম মিয়া বলেন, ‘সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাসে কাজ করি। অল্প বেতনে সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়। বাইরে একবেলা খাবার খেতেও অনেক টাকা লাগে। এখানে বিনামূল্যে ভালো খাবার পাওয়ায় আমাদের অনেক সুবিধা হচ্ছে। সপ্তাহে তিন দিন এখানে খেতে আসি। প্রতিদিন এমন ব্যবস্থা থাকলে আমাদের মতো শ্রমজীবী মানুষের আরও বেশি উপকার হতো।’
খাবার খেতে আসা ভবঘুরে জাকির হোসেন জানান, ‘মানুষের কাছে হাত পেতে যা পাই, তা দিয়ে কোনো দিন খেতে পারি, আবার কোনো দিন না খেয়েও থাকতে হয়। এখানে এসে পেট ভরে খাবার খেতে পারি। কেউ আমাদের অবহেলা করে না। সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খাই। এই তিন দিনের জন্য অপেক্ষা করি। যাঁরা আমাদের খাবার দেন, তাঁদের জন্য মন থেকে দোয়া করি।’
উদ্যোক্তারা জানান, প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে সপ্তাহে মাত্র একদিন খাবার বিতরণের মধ্য দিয়ে এই মানবিক কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়। পরে মানুষের ব্যাপক সাড়া ও চাহিদা বাড়তে থাকায় সপ্তাহে দুই দিন খাবার বিতরণ করা হয়। বর্তমানে সপ্তাহে তিন দিন নিয়মিত এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এ উদ্যোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্বেচ্ছাসেবীদের নিঃস্বার্থ অংশগ্রহণ। স্থানীয় কয়েকজন তরুণ স্বেচ্ছাসেবী কোনো ধরনের পারিশ্রমিক ছাড়াই খাবার পরিবেশন ও বিতরণের দায়িত্ব পালন করছেন। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।
শাহবাজ ফাউন্ডেশনের পরিচালক মোহাম্মদ ইয়ামিন মিয়া বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের মূল শাখা ঢাকায়। সেখানে শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করা হয়।
রূপগঞ্জের ভুলতায় প্রথমে সপ্তাহে একদিন খাবার বিতরণ শুরু করি। পরে দুই দিন এবং বর্তমানে তিন দিন খাবার বিতরণ করছি। মানুষের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য অসহায় ও ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ভবিষ্যতে এই কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে আরও বেশি মানুষকে বিনামূল্যে খাবার দেওয়া যায়।’
স্থানীয়দের মতে, সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা এ ধরনের মানবিক উদ্যোগে এগিয়ে এলে ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্ট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব। একই সঙ্গে সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধ আরও সুদৃঢ় হবে।
ব্যস্ততম ভুলতা ফ্লাইওভারের নিচে শাহবাজ ফাউন্ডেশনের এই দস্তরখানা এখন শুধু খাবার বিতরণের স্থান নয়, বরং অসহায় মানুষের কাছে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার এক আশ্রয়স্থল।
এমন উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হলে উপকৃত হবেন বহু অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
উপজেলা নির্বাহি অফিসার এসএম আব্দুল্লা বিন শফিক বলেন, জানা ছিল না। তবে এটা নিঃশন্দেহে ভাল উদ্যোগ। এভাবে সমাজের বৃত্তশালিরা এগিয়ে আসলে সমাজ থেকে অভাব অনটনসহ বেকারত্বও দুর হবে।
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জঃ 


















