ঢাকা ০৮:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ের কান্না, কাঁচা  আমন ধানেরগাছ যাচ্ছে গরুর পেটে, সর্বস্ব হারিয়ে দিশাহারা কৃষকেরা

​বর্ষা বিদায় নিয়ে হেমন্তের আগমন ঘটলেও লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনে নেমে এসেছে গভীর অমানিশা। পানি হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার তীব্র ভাঙনে মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষকের কষ্টের সোনালী ফসল। ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় লাল ও কাঁচা আমন ধান কাটতে বাধ্য হয়েছেন কৃষকেরা, যা এখন গোচারণভূমির অভাবে গবাদিপশুর খাবারে পরিণত হয়েছে। চরম উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নদীপারের শত শত মানুষ।

গত এক সপ্তাহে তিস্তার ভাঙনে ২৭টি পরিবারের বসতভিটা এবং প্রায় ৫০ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে না পেরে কাঁচা আমন ধান কেটে গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন কৃষকেরা (কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ইতিমধ্যে সাড়ে ১৭ বিঘা জমির কাঁচা ধান কাটা হয়েছে)। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের তিস্তা চর এলাকা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনের কথা জানালেও বরাদ্দের অভাবে তাৎক্ষণিক কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

​বর্ষা বিদায় নিয়ে প্রকৃতিতে এখন হেমন্তের আমেজ। চারদিকে আগাম নবান্নের উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা থাকলেও রংপুরের গঙ্গাচড়া ও লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনে তার ছিটেফোঁটাও নেই। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা নদীর ভাঙন রূপ নিয়েছে মহাবিপর্যয়ে একের পর এক ঘরবাড়ি,
রাস্তাঘাট ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তিস্তাপাড়ের খেটে খাওয়া মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি তিস্তার পানি বাড়ার পর স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে পানি কমতে শুরু করায় নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে সরাসরি আঘাত হানে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের জয়রামওঝা চল্লিশসাল চর এবং হাতীবান্ধা উপজেলার
ডাউয়াবাড়িতে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই অঞ্চলে ২৭টি পরিবারের বসতভিটা সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে তলিয়ে গেছে উঠতি আমন ধানসহ অন্তত ৫০ একর ফসলি জমি।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে রয়েছেন বাবর আলী, গোলাপী বানু, গোলজার হোসেন, নুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান, আহাদ আলী, জহুরা বেগম, আসাদুল ইসলাম, আব্দুল হক, মইনুল ইসলাম, শাহ আলম, নজু মিয়া, মোন্নাফ আলী, আবুল হোসেন, শফিকুল ইসলাম, দুলু মিয়া, নুরল ইসলাম, নাজমুল হক, ঝন্টু, বেলাল ও ওমরসহ আরও অনেকে। ঘরবাড়ি হারিয়ে তাঁরা এখন খোলা আকাশের নিচে বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
​তিস্তাপাড়ের কৃষকদের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল এই আমন ধান। কিন্তু ভাঙনের তীব্রতা এতটাই প্রকট যে, ঘরে তোলার আগেই পাকা ও আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হয়েছেন কৃষকেরা।

লালমনিরহাট জেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইখুল আরেফিন জানান, ভাঙন তীব্র হওয়ায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে কাঁচা আমন ধানের গাছ কেটে গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন। এখন পর্যন্ত কেবল ওই অঞ্চলেই সাড়ে ১৭ বিঘা জমির আমন ধান নষ্ট হয়ে গেছে।

ভাঙনের শিকার জাহেদুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, এবারের বন্যায় তেমন ক্ষতি হয়নি ভেবে স্বস্তিতে ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ তিস্তার স্রোতের গতিপথ আমাদের চরের দিকে ঘুরে যাওয়ায় সবকিছু মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল। ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল।

সরেজমিনে দেখা যায়, তীব্র স্রোতে প্রতিনিয়ত নদী ভাঙছে। ভাঙনকবলিত মানুষেরা নিজেদের
বসতভিটা কোনোমতে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন রোধে স্থায়ী বা তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী জানান, ভাঙনের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার জানানো হয়েছে। তাঁরা এলাকা পরিদর্শন করলেও ভাঙন রোধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেননি।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক জানান, বন্যার পর হঠাৎ ওই এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে আলোচনা করে ভাঙনরোধে খুব তারাতারি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে নদীপারের মানুষের প্রশ্ন, প্রশাসন আশ্বাস দিলেও কবে মিলবে ভাঙন থেকে স্থায়ী মুক্তির দেখা? সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে এই জনপদের।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ের কান্না, কাঁচা  আমন ধানেরগাছ যাচ্ছে গরুর পেটে, সর্বস্ব হারিয়ে দিশাহারা কৃষকেরা

লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ের কান্না, কাঁচা  আমন ধানেরগাছ যাচ্ছে গরুর পেটে, সর্বস্ব হারিয়ে দিশাহারা কৃষকেরা

আপডেট সময় : ০৮:৪০:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

​বর্ষা বিদায় নিয়ে হেমন্তের আগমন ঘটলেও লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনে নেমে এসেছে গভীর অমানিশা। পানি হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার তীব্র ভাঙনে মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষকের কষ্টের সোনালী ফসল। ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় লাল ও কাঁচা আমন ধান কাটতে বাধ্য হয়েছেন কৃষকেরা, যা এখন গোচারণভূমির অভাবে গবাদিপশুর খাবারে পরিণত হয়েছে। চরম উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নদীপারের শত শত মানুষ।

গত এক সপ্তাহে তিস্তার ভাঙনে ২৭টি পরিবারের বসতভিটা এবং প্রায় ৫০ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে না পেরে কাঁচা আমন ধান কেটে গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন কৃষকেরা (কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ইতিমধ্যে সাড়ে ১৭ বিঘা জমির কাঁচা ধান কাটা হয়েছে)। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের তিস্তা চর এলাকা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনের কথা জানালেও বরাদ্দের অভাবে তাৎক্ষণিক কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

​বর্ষা বিদায় নিয়ে প্রকৃতিতে এখন হেমন্তের আমেজ। চারদিকে আগাম নবান্নের উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা থাকলেও রংপুরের গঙ্গাচড়া ও লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনে তার ছিটেফোঁটাও নেই। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা নদীর ভাঙন রূপ নিয়েছে মহাবিপর্যয়ে একের পর এক ঘরবাড়ি,
রাস্তাঘাট ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তিস্তাপাড়ের খেটে খাওয়া মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি তিস্তার পানি বাড়ার পর স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে পানি কমতে শুরু করায় নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে সরাসরি আঘাত হানে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের জয়রামওঝা চল্লিশসাল চর এবং হাতীবান্ধা উপজেলার
ডাউয়াবাড়িতে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই অঞ্চলে ২৭টি পরিবারের বসতভিটা সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে তলিয়ে গেছে উঠতি আমন ধানসহ অন্তত ৫০ একর ফসলি জমি।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে রয়েছেন বাবর আলী, গোলাপী বানু, গোলজার হোসেন, নুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান, আহাদ আলী, জহুরা বেগম, আসাদুল ইসলাম, আব্দুল হক, মইনুল ইসলাম, শাহ আলম, নজু মিয়া, মোন্নাফ আলী, আবুল হোসেন, শফিকুল ইসলাম, দুলু মিয়া, নুরল ইসলাম, নাজমুল হক, ঝন্টু, বেলাল ও ওমরসহ আরও অনেকে। ঘরবাড়ি হারিয়ে তাঁরা এখন খোলা আকাশের নিচে বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
​তিস্তাপাড়ের কৃষকদের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল এই আমন ধান। কিন্তু ভাঙনের তীব্রতা এতটাই প্রকট যে, ঘরে তোলার আগেই পাকা ও আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হয়েছেন কৃষকেরা।

লালমনিরহাট জেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইখুল আরেফিন জানান, ভাঙন তীব্র হওয়ায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে কাঁচা আমন ধানের গাছ কেটে গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন। এখন পর্যন্ত কেবল ওই অঞ্চলেই সাড়ে ১৭ বিঘা জমির আমন ধান নষ্ট হয়ে গেছে।

ভাঙনের শিকার জাহেদুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, এবারের বন্যায় তেমন ক্ষতি হয়নি ভেবে স্বস্তিতে ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ তিস্তার স্রোতের গতিপথ আমাদের চরের দিকে ঘুরে যাওয়ায় সবকিছু মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল। ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল।

সরেজমিনে দেখা যায়, তীব্র স্রোতে প্রতিনিয়ত নদী ভাঙছে। ভাঙনকবলিত মানুষেরা নিজেদের
বসতভিটা কোনোমতে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন রোধে স্থায়ী বা তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী জানান, ভাঙনের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার জানানো হয়েছে। তাঁরা এলাকা পরিদর্শন করলেও ভাঙন রোধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেননি।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক জানান, বন্যার পর হঠাৎ ওই এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে আলোচনা করে ভাঙনরোধে খুব তারাতারি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে নদীপারের মানুষের প্রশ্ন, প্রশাসন আশ্বাস দিলেও কবে মিলবে ভাঙন থেকে স্থায়ী মুক্তির দেখা? সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে এই জনপদের।