একসময় ধরলা নদীর তীরে ছিল নিজের ভিটেমাটি। ছিল মাথা গোঁজার ঠাঁই, ছিল সংসার আর আপন ঠিকানার নিশ্চয়তা। কিন্তু ধরলার অব্যাহত ভাঙনে সেই ভিটেমাটি কয়েক বছর আগেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী কেড়ে নিয়েছে ঘর, জমি আর জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও।
এরপর থেকে অন্যের জায়গায় একটি জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে কোনো রকমে দিন কাটছে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙা ইউনিয়নের মধ্যকুমরপুরের নানকার পাড়া গ্রামের আহাম্মদ হোসেন (৬৫) ও তার স্ত্রী ছাপিয়া বেগম (৫০)-এর। বয়সের ভার, অসুস্থতা, দারিদ্র্য আর আপনজনের অবহেলার সঙ্গে প্রতিদিনই যেন নতুন করে লড়াই করতে হচ্ছে এই দম্পতিকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জীর্ণ টিনের ছোট একটি ঘরই তাদের একমাত্র সম্বল। ঘরের পাশে প্লাস্টিকের বস্তা টাঙিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী রান্নাঘর। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সেখানেই কোনো রকমে রান্না করেন ছাপিয়া বেগম। ঘরের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, সামান্য বৃষ্টি কিংবা ঝড় এলেই দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় তাদের।
তার ওপর নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। সন্ধ্যা নামলেই ঘরটিতে নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার। আশপাশের বাড়িগুলো যখন বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত হয়, তখন আহাম্মদ-ছাপিয়ার ঘরটি পড়ে থাকে অন্ধকারে।
আহাম্মদ হোসেন বলেন, “আমার তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে, তারা স্বামীর সংসারে থাকে। ছেলেরাও বিয়ের পর আলাদা হয়ে গেছে। অথচ এই সময়ে এসে বাবা-মায়ের একটু খোঁজ নেওয়ার সময়ও নেই ছেলেদের।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্টই বেরিয়ে আসে তার কণ্ঠে। একসময় যে বাবা-মা সন্তানদের মানুষ করতে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে সেই বাবা-মায়েরই এখন দিন কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছাপিয়া বেগম বলেন, “ছেলেরা বউ-বাচ্চা নিয়ে আলাদা থাকে, কেউ আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। খুব কষ্টে আমাদের দিন চলে। সবার বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও শুধু আমাদের ঘরেই আলো নেই। খাওয়া-দাওয়ারও খুব কষ্ট। কোনো আয়-রোজগার নেই, চলব কীভাবে বলুন?”
তার এই প্রশ্নের উত্তর যেন নেই কারও কাছে।
স্থানীয়রা জানান, আহাম্মদ হোসেন ও ছাপিয়া বেগম দীর্ঘদিন ধরেই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানোর পর বাধ্য হয়ে অন্যের জায়গায় কোনোমতে একটি ঘর তুলে বসবাস করছেন তারা। বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো কাজও করতে পারেন না।
কয়েকটি হাঁস-মুরগি পালন করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই কোনো রকমে দুবেলা খাবার জোটে তাদের। কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না—এভাবেই চলছে তাদের জীবন।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, এতদিনেও এই দম্পতি পাননি কোনো সরকারি ভাতা। ফলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা থেকেও বঞ্চিত এই দুই অসহায় মানুষ।
প্রতিবেশী শফিকুল ইসলাম বলেন, “ওরা খুব অসহায়। বয়স হয়েছে, এখন আর কাজ করতে পারেন না। ছেলেরা যদি অন্তত সামান্য দায়িত্বও নিত, তবে এত কষ্ট করতে হতো না এই বৃদ্ধ দম্পতির।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো এমন মানুষদের জন্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দ্রুত সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা, বিধবা/দুস্থ সহায়তা, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং একটি নিরাপদ ও টেকসই ঘর পেলে আহাম্মদ হোসেন ও ছাপিয়া বেগমের জীবনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমতে পারে।
কুড়িগ্রাম সদরের ভোগডাঙা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. সাঈদুর রহমান বলেন, “পরিবারটির দুর্দশার বিষয়ে আমি অবগত আছি। ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু সম্ভব তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা ও টেকসই আবাসন সুবিধা দেওয়া গেলে তাদের এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।”
ধরলার ভাঙন হয়তো কয়েক বছর আগেই আহাম্মদ হোসেন ও ছাপিয়া বেগমের ভিটেমাটি কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সেই ভাঙনের ক্ষত এখনো শুকায়নি। নিজের ঘর হারানোর পর তারা শুধু একটি ঠিকানাই হারাননি—হারিয়েছেন নিরাপত্তা, স্বস্তি আর নির্ভরতার শেষ আশ্রয়টুকুও।
জীবনের শেষ বয়সে এসে তাদের চাওয়া খুব বেশি নয়—একটি নিরাপদ ঘর, একটু আলো, দুবেলা খাবার এবং বেঁচে থাকার সামান্য নিশ্চয়তা। এখন প্রশ্ন, ধরলার ভাঙনে সর্বস্ব হারানো এই দম্পতির জীবনের অন্ধকার কি কোনোদিন কাটবে
ধরলার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের জায়গায় আহাম্মদ-ছাপিয়ার মানবেতর জীবন
-
মোঃ জাফর আহমেদ কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা - আপডেট সময় : ০২:০৪:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 1
জনপ্রিয় সংবাদ



















