হাওর বেষ্টিত নেত্রকোনায় গত ১১ বছরে আলোচিত ১১ জনের হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনো পুরোপুরি উদ্ঘাটন হয়নি।সরেজমিনে তদন্ত করে জানা গেছে এর মধ্যে চলতি বছরেই ঘটেছে চারটি হত্যাকাণ্ড। বাকিগুলো ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কোনোটির অভিযোগপত্র জমা পড়েনি।সরেজমিনে গিয়ে আরও জানা গেছে রহস্য উদ্ঘাটন না করেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে দুটি মামলায়। সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করে জানা গেছে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন এক দম্পতি, অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক, ব্যবসায়ী, শিশু ও ইজিবাইকচালক। সবশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন একজন সাংবাদিক। এসব হত্যা মামলার তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বললেই চলে, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তও করা যায়নি। এতে স্বজনদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। এ বিষয়ে এই প্রতিনিধিকে নেত্রকোনা পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাগুলো তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কাজ করছে। আশা করা যাচ্ছে, মামলাগুলোর রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।সরেজমিনে গিয়ে আরও জানা গেছে, ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো হত্যা মামলাটি ২০১৫ সালের। ওই বছরের ২৩ অক্টোবর দুর্গাপুর পৌর শহরের ব্যবসায়ী অরুণ কুমার সাহা (৭৪) ও তাঁর স্ত্রী হেনা রানী সাহাকে (৬৫) নিজেদের বাসার শয়নকক্ষে গলা কেটে হত্যা করা হয়। অরুণ সাহা দূর্গাপুর উপজেলা শহরের মধ্যবাজার এলাকার সুবর্ণা প্লাজা ও সুবর্ণা বস্ত্রালয়ের মালিক ছিলেন। ঘটনার তিন দিন পর তাঁদের বড় ছেলে সুজিত কুমার সাহা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন।
এদিকে পুলিশ ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের বরাতে জানা গেছে, অরুণ ও হেনা দম্পতি হত্যা মামলাটি প্রথমে দুর্গাপুর থানা-পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। পরে ২০১৫ সালের নভেম্বরে সিআইডি এবং ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব নেয়। এ মামলায় মোট ৯ বার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। সর্বশেষ পিবিআইয়ের পরিদর্শক অভি রঞ্জন দেব ২০২৪ সালের জুনে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন। তদন্ত কর্মকর্তা তখন এই প্রতিনিধিকে বলেছিলেন, ঘটনার সময় অপরাধস্থল ও প্রয়োজনীয় আলামত সংরক্ষণ করা হয়নি। এ কারণে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। এই মামলাটি নিয়ে হতাশা দেখা দিয়েছে ছেলে সুজিত কুমার সাহার মধ্যে। তিনি বলেন, ‘পুলিশ দীর্ঘদিন তদন্ত করেও রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। আমি চাই, আমার মা–বাবার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হোক। আরও জানা যায়, ২০২১ সালের ২১ ডিসেম্বর মাসে কলমাকান্দার রংছাতি ইউনিয়নের তেরোতোপা গ্রামের গরু ব্যবসায়ী মো. মজিবুর রহমানকে (৫০) হত্যার পর তাঁর হাত-পা বেঁধে লাশে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় তাঁর বড় ভাই বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পেরে সংস্থাটি প্রায় এক বছর আগে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এ বিষয়ে এই মামলার বাদী আতাউর রহমান বলেন, ‘পুলিশ যেহেতু রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি, তাই পরে আর নারাজি দিইনি। সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করে আরও জানা গেছে, ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি দুর্গাপুর উপজেলার পূর্ব নলোয়াপাড়া গ্রামের ইজিবাইকচালক মজিবুর রহমানের (২৪) গলাকাটা লাশ কলমাকান্দার একটি ধানখেত থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা মামলা করেন।এখন পর্যন্ত এই মামলার কোনো অগ্রগতি নেই।
এদিকে সরেজমিনে গিয়ে আরও জানা যায়, ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি নেত্রকোনা শহরের বড়বাজার এলাকায় নিজ বাসায় খুন হন অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক দিলীপ কুমার সাহা রায় (৭১)। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী বিভা সাহা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। এখন পর্যন্ত এই মামলারও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বিভা সাহা বলেন, ‘স্বামীকে তো আর ফিরে পাব না। কিন্তু আমি চাই, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। এদিকে ২০২৫ সালের ১৬ জুন মাসে মদনের দেওসহিলা গ্রামে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয় ছয় বছরের শিশু সৌরভ মিয়া। পরে প্রতিবেশী বনার চৌধুরীর গোয়ালঘর থেকে তার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সৌরভের বাবা বাদী হয়ে প্রতিবেশী মো. জিয়াকে প্রধান আসামি করে সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। তবে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি। তবে জিয়াসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা কারাগারে আছেন। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা এখনো সম্ভব হয়নি। সরেজমিনে গিয়ে আরও জানা যায়, ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর রাতে মোহনগঞ্জ পৌর শহরের থানা রোডের একটি দোকান থেকে মুদিদোকানি নারায়ণ পালের (৪৪) গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁর দোকানটি থানার কাছেই। তবে ঘটনার দুই দিন পর অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন নারায়ণ পালের স্ত্রী লিপি রানী পাল। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। কারও সঙ্গে তাঁর শত্রুতা ছিল না। আমি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি চাই।
এদিকে সরেজমিনে গিয়ে আরও জানা গেছে, চলতি বছরের ৪ মে মাসে কলমাকান্দা উপজেলার হুগলি জসিউড়া গ্রামে বাড়ির উঠান থেকে নিখোঁজ হয় পাঁচ বছরের শিশু জান্নাত আক্তার। দুই দিন পর বাড়ির পেছনের ধানখেত থেকে তার খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা আসাদ মিয়া প্রতিবেশী মো. মজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।জানা গেছে এই মামলারও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই।চলতি বছরের ২৫ জুলাই রাতে নেত্রকোনা সদর উপজেলার দুয়ানী দুধকুড়া পশ্চিমপাড়া গ্রামের নিজ ঘরে ঘুমাতে যান মাহফুল মিয়া (৩৬)। পরদিন ভোরে তাঁর মা বিছানায় ছেলের গলাকাটা লাশ দেখতে পান। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা হয়েছে। তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। অন্যদিকে ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির (৪২)। হত্যাকাণ্ডের পরদিন আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাত পরিচয়ে সাত থেকে আটজনকে আসামি করে মামলা করেন। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই দিন নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ সড়কের পাশে সদর উপজেলার সিংহের বাংলার নোয়াপাড়া এলাকায় একটি জঙ্গল থেকে রুকন মিয়া (৩৫) নামের এক ইজিবাইকচালকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর হাত-পা ও মুখে স্কচটেপ প্যাঁচানো ছিল। এ ঘটনায় রুকনের স্ত্রী মিনা আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছে নেত্রকোনা জেলা পুলিশ।
সোহেল খান দূর্জয়-নেত্রকোনা : 


















