রাঙ্গুনিয়ায় পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, এক ছেলের সন্ধান ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম: স্বামীকে হারানোর পর তিন সন্তানকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন রুবি আক্তার। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা, পারিবারিক বিরোধ ও নানা প্রতিকূলতা। সন্তানদের নিয়ে জীবন চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রামে পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাননি বলে জানিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিনের এই পরিস্থিতির মধ্যেই ওয়ারিশি সম্পত্তির অধিকার, নির্যাতনের অভিযোগ এবং এক ছেলের সন্ধান না পাওয়ার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
রুবি আক্তার ও তাঁর পরিবারের বক্তব্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ১৫ নম্বর লালানগর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের এই ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে উঠে এসেছে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, জমি হস্তান্তরের প্রশ্ন, ওয়ারিশ সনদ যাচাইয়ের দাবি এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো।
স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তানকে নিয়ে সংগ্রাম
রুবি আক্তার জানান, ১৯৮৯ সালের ৭ জুলাই বাদশা মিয়ার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে—মোহাম্মদ ইমাম উদ্দিন, মোহাম্মদ আলী আকবর ও তারা বেগমের জন্ম হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাদশা মিয়া ১৯৯৯ সালের ১০ আগস্ট মারা যান।
স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তানকে নিয়ে তাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে বলে দাবি করেন রুবি আক্তার। তাঁর অভিযোগ, ওই সময় পরিবারকে সহযোগিতা করার মতো কেউ পাশে ছিলেন না। সন্তানদের নিয়ে কীভাবে জীবনযাপন করেছেন এবং কী ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন, সে অভিজ্ঞতার কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন তিনি।
ওয়ারিশি সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ
রুবি আক্তারের অভিযোগ, তাঁর স্বামীর সম্পত্তিতে তাঁদের পরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। তাঁর দাবি, বাদশা মিয়ার কোনো ছেলে সন্তান ছিল না—এমন বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁদের ওয়ারিশি অধিকার অস্বীকারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, জমির দলিল, ওয়ারিশ সনদ, জন্মনিবন্ধন ও ভোটার তালিকাসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা হলে পারিবারিক পরিচয় ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিরোধের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
রুবি আক্তারের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ২৫ আগস্ট মনোয়ারা বেগম, ২০০৩ সালে আবদুল হাকিম তালুকদার এবং ২০০৫ সালে কাদের মোল্লা সংশ্লিষ্ট জমির অংশ কেনেন। এসব জমি হস্তান্তরের দলিল যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
জমি লিখে দেওয়ার চাপ ও নির্যাতনের অভিযোগ
রুবি আক্তার ও তাঁর ছেলে মোহাম্মদ আলী আকবরের অভিযোগ, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। পরে জমি অন্যদের নামে লিখে দেওয়ার জন্য বাদশা মিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ ও তাঁকে মারধর করা হয় বলে দাবি করেন তাঁরা।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার রাতেই বাদশা মিয়া স্ট্রোক করে মারা যান। তবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা চিকিৎসাসংক্রান্ত বা অন্য কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
রুবি আক্তারের আরও অভিযোগ, স্বামীর মৃত্যুর কয়েক দিন পর তাঁকে ও সন্তানদের জমি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
বাবার কবর জিয়ারত করতে গিয়ে মারধরের অভিযোগ
মোহাম্মদ আলী আকবরের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর আগে তিনি মিরসরাই উপজেলায় তাঁর মা ও বোনের সঙ্গে নানার বাড়িতে বসবাস করছিলেন। সেখান থেকে বাবার কবর জিয়ারত করতে রাঙ্গুনিয়ায় এলে কবরস্থান থেকে তাঁকে ডেকে নিয়ে কাদের মোল্লা ও রিটন নামে এক ব্যক্তি মারধর করেন।
তাঁর দাবি, এ সময় তাঁকে আবার ওই এলাকায় দেখা গেলে জীবন্ত কবর দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, রুবি আক্তারের অভিযোগ, কয়েক বছর আগে বাবার কবর জিয়ারত করতে গিয়ে তাঁকেও একটি ঘরে নিয়ে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ঘটনার স্বাধীন সমর্থনকারী নথি পাওয়া গেলে তা অনুসন্ধানের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে সহায়ক হবে।
এক ছেলের সন্ধান চায় পরিবার
রুবি আক্তারের পরিবারের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দাবিগুলোর একটি হলো এক ছেলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। তাঁর অভিযোগ, ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার পর তিন দিন আটকে রাখা হয়েছিল এবং তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত হিসেবে সম্পত্তি নিয়ে একটি প্রস্তাবে রাজি হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
রুবি আক্তারের দাবি, পরিবারের অন্য সন্তানদের ক্ষতির হুমকির মুখে তাঁরা ওই প্রস্তাবে রাজি হয়ে জমি লিখে দেন। কিন্তু এরপরও ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এখন পর্যন্ত ছেলের সন্ধান পাননি বলে দাবি করেন রুবি আক্তার। তবে নিখোঁজ ব্যক্তির পূর্ণ পরিচয়, নিখোঁজ হওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় এবং এ বিষয়ে কোনো পুলিশি নথি বা তদন্ত রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার আবেদন
রুবি আক্তার ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ওয়ারিশি সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণ, জমির দলিল ও ওয়ারিশ সনদ যাচাই, নিখোঁজ ছেলের সন্ধান এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিনের বিরোধের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী তাঁদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হোক। তাঁরা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতাও কামনা করেছেন।
অনুসন্ধানে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন
এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে বাদশা মিয়ার সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল, পরিবারের ওয়ারিশ সনদ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং নিখোঁজ ছেলের বিষয়ে পুলিশি নথি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তাঁদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য: প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় কাদের মোল্লা, রিটন, মনোয়ারা বেগম ও অন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন নথি, সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তান নিয়ে রুবি আক্তারের জীবনসংগ্রাম, ওয়ারিশি সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে ন্যায়বিচারের আকুতি
-
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | ওমর ফারুক - আপডেট সময় : ০৪:২১:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
- 5
জনপ্রিয় সংবাদ



















