ভাটি বাংলার রাজধানী খ্যাত নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতিতেও ছিল অনন্য। সময়ের ব্যবধানে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এ অঙ্গণ আজ যেন ভাটার টানে প্রাণহীন।
মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গন একসময় মুখরিত ছিল গান, কবিতা ও সাহিত্য চর্চায়। নাট্য চর্চায়ও পিছিয়ে ছিল না। মোহনগঞ্জের মতো একটা মফস্বল শহরে টিকিট কেটে নাটক দেখতো দর্শক। প্রচুর দর্শক হতো। মোহনগঞ্জে ছিল, নাট্যকার, অভিনেতা, শিল্পী ও কলা কুশলি সবই।
তবে গত বিশ বছর ধরে উপজেলায় এসব শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা নেই বললেই চলে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সাংস্কৃতিক সংগঠকেরা দ্রুত শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন।
শিল্পকলা একাডেমিতে থাকা বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ও অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের কোনো খোঁজ খবর নেই। এ ছাড়া একাডেমির নামে বিভিন্ন সময়ে আসা সরকারি বরাদ্দের ব্যয় নিয়েও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে নানাবিধ প্রশ্ন।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশির দশকে ‘শিল্পকলা পরিষদ’ নামে মোহনগঞ্জে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের যাত্রা শুরু হয়েছিল। উপজেলা পরিষদের একটি হলরুম এর জন্য বরাদ্দ ছিল। পদাধিকারবলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন এর সভাপতি। স্থানীয় একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিকে করা হতো সাধারণ সম্পাদক। পরে এটি উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে রূপ নেয়।
শিল্পকলা একাডেমি এবং স্থানীয় শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা জানান, আশি-নব্বইয়ের দশকে মোহনগঞ্জ ছিল শিল্প-সংস্কৃতির চর্চায় সমৃদ্ধ উপজেলা। ২০১০ সালে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম একেবারে স্তিমিত হয়ে এলে শিল্প
সংস্কৃতির চর্চাও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
তবে ২০২১-২২ সালের দিকে শিল্পকলা একাডেমি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি আলোর মুখ দেখেনি। সে সময় একটি আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছিল। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অমল সরকারকে আহ্বায়ক করা হয়েছিল। শিক্ষার্থী ভর্তি করার জন্য ফরমও ছাড়া হয়েছিল।
অমল সরকার বলেন, সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি। তাঁর মতে, শিল্পকলা একাডেমির কমিটি গঠনের পদ্ধতিতেও সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইউএনও সভাপতি, আর একজন সরকারি কর্মকর্তা সদস্যসচিব। তাঁরা স্থানীয় শিল্পী বা শিক্ষার্থীদের কতটা চেনেন? সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালাতে হলে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা দরকার।’
বারহাট্টাসহ অন্য কিছু উপজেলায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেখানে কার্যক্রম ভালো হচ্ছে।’
একসময় মোহনগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে হারমোনিয়াম, কি-বোর্ড, তবলাসহ বেশ কিছু দামি বাদ্যযন্ত্র ছিল। বিভিন্ন সরকারের সময়ে একাডেমির জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দও এসেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু এখন এসবের কোনো হদিস নেই।
অমল সরকার বলেন, ‘কোন বাদ্যযন্ত্র কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, কেউ জানে না। কিছু জিনিস কেউ কেউ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলেও শুনেছি। ইউএনওর প্রশাসনিক ভবনের পরিত্যক্ত মালপত্রের গুদামে কিছু বাদ্যযন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।’
২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগপর্যন্ত শিল্পকলা একাডেমির কক্ষে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সূর্যমুখী থিয়েটার। ৫ আগস্টের পর সংগঠনটি ওই কক্ষ ছেড়ে চলে যায়। সূর্যমুখী থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম পিয়াস বলেন, ‘বর্তমানে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধই বলা যায়। আগে কবি রইস মনরমের বাসায় সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক আয়োজন হতো। সেটিও এখন কমে গেছে। তিনি নিজের বাসায় স্বল্প পরিসরে সাংস্কৃতিক চর্চার আলোটা ধরে রেখেছেন।’ অন্বেষা সাহিত্য সংসদের সভাপতি সুমন মাহমুদ শেখ বলেন, “যথাযথ কর্তৃপক্ষের অবহেলায় মোহনগঞ্জে সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম সরকারি আমলা দিয়ে নয় বরং স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে হলে হয়তো আবারও ফিরে আসতে পারে সেই সাংস্কৃতিক আবহ।”
হাওরাঞ্চলের কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক রইস মনরম বলেন, ‘আগের সেই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অঙ্গন আবার দেখতে চাই। তরুণদের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা দরকার। এতে তাদের মনের বিকাশ ঘটবে, মানবিক মূল্যবোধ তৈরি হবে; পাশাপাশি খেলাধুলার সুযোগও বাড়াতে হবে। সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকলে তরুণেরা মাদক থেকেও দূরে থাকবে।’
মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন জানান, যন্ত্রসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কোথায় আছে, সেটিও তিনি জানেন না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সারা দেশে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর আগে প্রতিবছর শিল্পকলা একাডেমির জন্য সরকারি বরাদ্দ আসত। সেই টাকা কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। তিনি জানান, কিছুদিনের মধ্যে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চালু করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চিঠি আসার কথা রয়েছে।
উপজেলায় পুরোনো শিল্পকলা একাডেমিতে শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চা বন্ধ থাকলেও ২০২৩ সালে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় দুই একর জায়গার উপর নির্মাণ করা হয়েছে একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। উপমহাদেশের প্রখ্যাত
সজ্ঞীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের নামে তা নামকরণ করা হয়েছে ‘শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে তিন তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবন, আধুনিক মিলনায়তন, একটি জাদুঘর, ৩১০ আসনের মাল্টিপারপাস কনফারেন্স হলরুম এবং একটি আধুনিক মুক্তমঞ্চ রয়েছে। রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি চর্চার জন্য এটি করা হয়। তবে নির্মাণের তিন বছর পর আজও সেখানে একটিও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়নি। জনগণের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে। এর ভেতরে অনেক আসবাবপত্র ও সরঞ্জামাদী অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ যেন সেই প্রবাদের বাস্তব রূপ- “সরকার ক্যা মাল, দরিয়া মে ঢাল।”
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে নেই কার্যকর শিল্পকলা একাডেমি, ভাটার টানে শিল্প সংস্কৃতি চর্চা
-
মোঃ নাঈম হোসেন নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি - আপডেট সময় : ০৬:৫৯:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 1
জনপ্রিয় সংবাদ



















