চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ৩নং স্বনির্ভর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হোসনাবাদ ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির পরিবারের ওয়ারিশান সনদ ইস্যু করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক এখতিয়ার, সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় সনদ ইস্যুর নথিপত্র যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী পক্ষ।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ব্রহ্মময়ী সাহার পরিবারের উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিষয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর তিন কন্যা হলেন সুধীর বালা সাহা, তুলশী বালা সাহা ও সরণলতা সাহা। তাঁদের মধ্যে সুধীর বালা সাহা মৃত্যুকালে মতিলাল সাহা নামে এক পুত্রসন্তান রেখে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোসনাবাদের বাসিন্দার সনদ স্বনির্ভর ইউনিয়ন থেকে কেন?
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুধীর বালা সাহার বিয়ে হয়েছিল রাঙ্গুনিয়ার খীলমোগল হোসনাবাদ এলাকায় এবং তিনি হোসনাবাদ ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর ওয়ারিশদের বিষয়ে হোসনাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পূর্বে ওয়ারিশান সনদ ইস্যু করা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ অবস্থায় একই ব্যক্তি বা পরিবারের উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সনদ ৩নং স্বনির্ভর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কীভাবে এবং কোন নথির ভিত্তিতে ইস্যু করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তবে সনদ ইস্যুর এখতিয়ার নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত ও স্থায়ী ঠিকানা, মৃত্যুর তথ্য, আবেদনকারীর পরিচয়, স্থানীয় তদন্তের প্রতিবেদন এবং পরিষদের সংরক্ষিত নথিপত্র পরীক্ষা করা জরুরি। শুধু ভিন্ন ইউনিয়ন থেকে সনদ ইস্যু হওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে একে জালিয়াতি বলা যায় না; এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিবিধান ও নথির ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করতে হবে।
সম্পত্তি দান ও উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মতিলাল সাহা তাঁর নানার কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি রাঙ্গুনিয়া মজুমদারখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য দান করেছিলেন। তবে সম্পত্তিটি কীভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁর কাছে এসেছিল, দানের সময় মালিকানা কার নামে ছিল এবং দানসংক্রান্ত দলিল যথাযথভাবে সম্পাদিত হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দলিল, খতিয়ান, নামজারি, ভূমি রেকর্ড, দানপত্র এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল পরীক্ষা করলে সম্পত্তির মালিকানা ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিরোধের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
আমমোক্তারনামা ও চাঁদা দাবির অভিযোগ
ওয়ারিশান সনদ তৈরি এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা-সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারী পক্ষ। তাঁদের দাবি, এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের একজন সভাপতি ও চেয়ারম্যান এবং বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি যৌথভাবে জড়িত থাকতে পারেন। অভিযোগে চাঁদা দাবির উদ্দেশ্য থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম, নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ, অর্থ দাবির প্রমাণ কিংবা এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগের তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, প্রাসঙ্গিক নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য যাচাই ছাড়া কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
তদন্তে যেসব বিষয় যাচাই করা জরুরি
ঘটনার প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—
১. সুধীর বালা সাহার স্থায়ী বাসস্থান কোথায় ছিল এবং তাঁর উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সনদ ইস্যুর ক্ষেত্রে কোন ইউনিয়ন পরিষদের কী ধরনের এখতিয়ার ছিল?
২. হোসনাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আগে কোনো ওয়ারিশান সনদ ইস্যু হয়ে থাকলে, পরবর্তী সনদ প্রদানের সময় সেটি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না?
৩. স্বনির্ভর ইউনিয়ন পরিষদে সনদের জন্য করা আবেদনপত্র, ওয়ারিশদের তালিকা, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, স্থানীয় তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুমোদন নথিতে রয়েছে কি না?
৪. দুই ইউনিয়ন পরিষদের সনদে উত্তরাধিকারীদের নাম, সম্পর্ক, ঠিকানা বা অন্যান্য তথ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না?
৫. সম্পত্তি দানসংক্রান্ত দলিল এবং আমমোক্তারনামার সঙ্গে ওয়ারিশান সনদের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না?
৬. চাঁদা দাবির অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত অভিযোগ, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, বার্তা, আর্থিক লেনদেনের তথ্য বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না?
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নথি যাচাই প্রয়োজন
এ বিষয়ে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে ৩নং স্বনির্ভর ইউনিয়ন পরিষদ ও হোসনাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার, আবেদনপত্র এবং সনদ ইস্যুর নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অভিযোগকারী পক্ষ এবং অভিযোগে সম্পৃক্ততার কথা বলা ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
নথিপত্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী পক্ষ। অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য শোনা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা অপরিহার্য।
সনদ ইস্যুর প্রশাসনিক এখতিয়ার, উত্তরাধিকারীদের প্রকৃত পরিচয় এবং সম্পত্তির মালিকানা—এই তিনটি বিষয়ের নথিভিত্তিক যাচাইই পারে অভিযোগের প্রকৃত সত্য সামনে আনতে।
রাঙ্গুনিয়ায় ওয়ারিশান সনদ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ: হোসনাবাদের বাসিন্দার সনদ স্বনির্ভর ইউনিয়ন থেকে ইস্যু, তদন্তের দাবি
-
ওমর ফারুক | রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি - আপডেট সময় : ০৪:৫৫:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- 7
জনপ্রিয় সংবাদ



















