১৭ বছরের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনআমলে বিরোধী মত দমনে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার, হেফাজত নির্যাতন এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সেই কালরাত্রিরই শিকার হয়েছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের তিনজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। তৎকালীন সময়ে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর নির্যাতন চালিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রভাবে দীর্ঘ সময় ধরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার তো দূরের কথা, সাধারণ আইনি প্রক্রিয়াও স্তব্ধ করে রাখা হয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে যখন নতুন করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়, তখন এই তিন শিবিরকর্মী হত্যার বিচার চেয়ে ১২ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
কুয়াশার অন্তরালে মামলা ও থানা ইনচার্জের যোগদান কেন্দ্রিক বিতর্ক
মামলাটি দায়েরের পর থেকে আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোচ্ছিল, তা অনেকটাই সাধারণ জনগণের অগোচরে রয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ দিন এক ধরণের অনিশ্চয়তা ও নীরবতার মধ্যে ঢেকে পড়েছিল ঘটনার অগ্রগতি। তবে সম্প্রতি মহেশপুর উপজেলায় থানা ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে ইমরান হোসেন যোগদান করার পর হঠাৎ করেই মামলাটি নতুন করে জনসমক্ষে ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।
দীর্ঘদিন কুয়াশাবৃত থাকা এই সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে হঠাৎ করেই কালিগঞ্জের কিছু তৎকালীন সুবিধাভোগী ও ফ্যাসিবাদী আমল ঘেঁষা সাংবাদিকের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। উক্ত সাংবাদিকরা সংশ্লিষ্ট থানা ইনচার্জের পক্ষে অতি-উৎসাহী হয়ে একপাক্ষিক সংবাদ পরিবেশন ও তার সাফাই গাইতে শুরু করেছেন। অপরাধ ও আইনি তদন্তের প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বদলে বিতর্কিত ওই কর্মকর্তাদের পক্ষাবলম্বন করায় সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, “সাংবাদিকদের এই পক্ষপাতমূলক ও অতি-উৎসাহী অবস্থান ওসি সাহেবকে বাঁচাতে পারছে না, বরং তিনি দিন দিন আইনের বেড়াজালে আরও বেশি আটকে পড়ছেন।”
রাজনৈতিক মামলা ও স্বৈরাচারী আমলের জুলুমের স্মৃতি
তৎকালীন সরকারের আমলে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কীভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় ফাঁসানো হতো, তার একটি বাস্তব উদাহরণ স্মৃতিচারণ করে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা ও ভুক্তভোগী জানান, ফ্যাসিবাদী আমলে গাছ কাটা ও মূর্তি ভাঙার মতো ভিত্তিহীন অভিযোগে একটি গায়েবি মামলা দায়ের করা হয়। উক্ত মামলায় জামায়াতের উপজেলা আমীর ওলিয়ার রহমানসহ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ২২ জন নামীয় নেতাকর্মী এবং খয়েরতলা, বাকুলিয়া, দুর্গাপুর, সুন্দরপুর, কমলাপুর ও কাদীর কোল এলাকার অসংখ্য সাধারণ মানুষসহ মোট ৭৬ জনকে আসামি করা হয়।
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করেছি আমরা, আমাদের ছোট ভাইয়েরা জীবন দিয়ে শহীদ হয়েছে। অথচ আজ স্বৈরাচারের দোসর সাংবাদিকদের মায়াকান্না দেখতে হচ্ছে ফ্যাসিবাদীদের জন্য! তাদের বিরুদ্ধে কোনো সত্য প্রকাশ করলেই এখনো কেন তাদের গায়ে লাগে?”
গণমাধ্যমকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আহ্বান এবং আদালতের প্রতি আস্থা
সংবাদপত্রের নিরপেক্ষ ভূমিকা বজায় রাখতে সুযোগসন্ধানী ও তোষামোদকারী সাংবাদিকদের প্রতি কঠোর আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যে সকল পিতা-মাতা সন্তান হারিয়ে আজও বুকফাটা আর্তনাদ করছেন, তাদের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা জানানোই হওয়া উচিত গণমাধ্যমের কাজ।
কে অপরাধী আর কে নির্দোষ, সে সিদ্ধান্ত নেবে দেশের স্বাধীন বিচার বিভাগ ও উচ্চ আদালত। বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ বা কাউকে আড়াল করার এই অপচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।
আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সর্বস্তরে আইনের সঠিক প্রয়োগ দেখতে চাই। উচ্চ আদালতের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলো আশা করে, সকল বাধা ও তোষামোদ পেরিয়ে তিন শিবিরের কর্মী হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।
ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধিঃ 


















